হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী। খাদিজা রাঃ এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। Alfamito Blog

হযরত খাদিজা রাঃ ইতিহাসের এক অনন্য নাম। মুসলিম মেয়েদের আদর্শ। বিবি খাদিজা রাঃ এর জীবন-ইতিহাসে আপনারা দেখতে পাবেন বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, সাহসিকতা, ধৈর্য ও ভালোবাসার বিরল চিত্র। তো এই পুরো আর্টিকেলে মহিয়সি হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করব।

হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী

হযরত খাদিজা রাঃ সম্পর্কে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য। 

প্রশ্ন উত্তর
নাম খাদিজা
কুনিয়ত উন্মে হিন্দ
লকব তাহেরাহ
বংশধারা খাদিজা বিনতে খুয়ায়েদ বিন আসাদ বিন আব্দুল উজ্জা বিন কুসাই।

হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী

নাম খাদিজা। কুনিয়ত উন্মে হিন্দ। লকব তাহেরাহ। বংশধারা হলোঃ খাদিজা(রাঃ) বিনতে খুয়ায়েদ বিন আসাদ বিন আব্দুল উজ্জা বিন কুসাই। 

প্রশ্ন উত্তর
পিতার নাম খুয়ায়েলদ বিন আসাদ
মাতার নাম ফাতিমা বিনতে যায়েদা
জন্ম ৫৫৫ খৃস্টাব্দ
মৃত্যু নবুয়তের ১০ম বছরের ১১ই রমযান।

হযরত খাদিজা রাঃ এর মাতা পিতার নাম এবং পরিচয়

মাতার নাম ছিল ফাতিমা(রাঃ) বিনতে যায়েদা। তিনি আমের বিন জুরীর বংশের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

হযরত খাদিজার (রাঃ) এর পিতা খুয়ায়েলদ বিন আসাদ একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি শুধু স্বগোত্রেই মহান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন না বরং সুন্দর আদান- প্রদান ও বিশ্বস্ততার কারণে সমগ্র কোরেশের মধ্যে জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।

উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাঃ এর জন্ম ও শৈশবকাল

'হাতীর সাল'-এর ১৫ বছর পূর্বে ৫৫৫ খৃস্টাব্দে হযরত খাদিজা (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকাল থেকেই তিনি নেক ও শরীফ প্রকৃতির ছিলেন। তিনি সকলের প্রশংসার পাত্র ছিলেন।

খাদিজা রাঃ এর বিয়ে 

এখন আমরা মহিয়সি হযরত খাদিজা রাঃ এর বিয়ে প্রসঙ্গে জানবো, বুঝার সুবিধার্থে নিচে সুন্দর করে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রথম বিবাহ, খাদিজা রাঃ এর প্রথম স্বামীর নাম

বয়োপ্রাপ্ত হলে আবু হালাহ হিন্দ বিন নাবাশ তামিমীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আবু হালাহর ঘরে তাঁর দু'টি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। এক পুত্রের নাম ছিল হালাহ ।জাহেলী যুগেই সে মৃত্যুবরণ করে। দ্বিতীয় পুত্রের নাম হলো হিন্দ। কতিপয় রাওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিবাহ 

আবু হালাহর ইন্তেকালের পর হযরত খাদিজার (রাঃ) দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছিল আতিক বিন আবেদ মাখজুমীর সঙ্গে। তার ঘরেও একটি মেয়ে-জন্ম নিয়েছিল। তার নাম ছিল হিন্‌দ। কিছুদিন পর আতিক বিন আবেদও মারা যান। 

খাদিজা রাঃ এর তৃতীয় বিবাহ

এক রাওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত খাদিজার তৃতীয় বিয়ে হয়েছিল তাঁর চাচাত ভাই ছাইফী বিন উমাইয়ার সাথে। তার ইস্তেকালের পর জনাব রাসুলে কারিমের (সাঃ) সঙ্গে হযরত খাদিজার (রাঃ) বিয়ে সুসম্পন্ন হয়। কিন্তু অন্যান্য রাওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত খাদিজার(রাঃ) তৃতীয় এবং শেষ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় হযরত রাসুলে করিমের(সাঃ).

মুহাম্মাদ সা এর সাথে খাদিজা রাঃ এর বৈবাহিক সম্পর্ক।

প্রিয় নবীর (সাঃ) পানি গ্রহণের পূর্বে হযরত খাদিজাতুল কুবরা(রাঃ) বৈধব্যকালে একাকীত্বে সময় কাটাতেন। কিছু সময় তিনি কাবা শরীফে অতিবাহিত করতেন এবং কিছু সময় সমকালীন সম্ভ্রান্ত মহিলা গণকদের সঙ্গে ব্যয় করতেন। সে সময় তিনি তাদের সঙ্গে তৎকালীন বিপ্লব নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করতেন। কোরেশের বড় বড় সরদার তাঁর নিকট বিয়ের পয়গাম প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেইসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কেননা একের পর এক দুঃখে তাঁর মন দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে ছিল।

এদিকে বার্ধক্যের কারণে তাঁর পিতা নিজের বিরাট বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা প্রশ্নে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। কোন পুত্র সন্তান জীবিত ছিলনা। সকল কাজ-কারবার মেধা ও ব্যুৎপত্তি সম্পন্ন কন্যার হাতে সোপর্দ করে তিনি নির্জনত্বে চলে যান। কিছুদিন পর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। কতিপয় রাওয়ায়েতে আছে যে, হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) পিতা খুয়ায়েলদ বিন আসাদ ফুজ্জারের যুদ্ধে মারা যান এবং তাঁর চাচা আমর বিন আসাদ তাঁর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। যাহোক এটা সন্দেহাতীত ব্যাপার যে, প্রিয় নবীর (সঃ) সঙ্গে তাঁর বিয়ের সময় খুয়ায়েদ জীবিত ছিলেন না এবং আমর বিন আসাদই হযরত খাদিজার (রাঃ) অভিভাবক ছিলেন।

হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ) সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ব্যবসা অব্যাহত রাখলেন। সে সময় তাঁর ব্যবসা একদিকে সিরিয়া এবং অন্যদিকে সমগ্র ইয়েমেনে বিস্তৃত ছিল। এই বিরাট ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি বিপুল সংখ্যক কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। এদের মধ্যে আরব, ইহুদী ও খৃস্টান কর্মচারী এবং গোলাম ছিল। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বস্ততার কারণে তাঁর ব্যবসা ক্রমেই উন্নতির দিকে এগিয়ে চলছিল। এসময় তিনি একজন অসাধারণ যোগ্য, মেধাসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত লোকের সন্ধানে ব্যাপৃত ছিলেন, যাতে তিনি নিজের নেতৃত্বে এই সকল কর্মচারীকে বাণিজ্যিক কাফেলার সঙ্গে বাইরে প্রেরণ করতে পারেন।

যুগটি ছিল সেই যুগ যখন প্রিয় নবীর(সাঃ) পবিত্র চরিত্র ও সুন্দর গুণাবলীর কথা প্রতিটি ঘরে আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। 

সে সময় তিনি ছিলেন যুবক এবং সমগ্র জাতির মধ্যে আমিন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। হযরত খাদিজাতুল কুবরার(রাঃ) কানে এই পবিত্র ব্যক্তির কথা না পৌছাটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তিনি নিজের ব্যবসা তত্ত্বাবধানের জন্য এই ধরনের গুণ বিশিষ্ট ব্যক্তির সন্ধানেই ছিলেন। তিনি হুজুরকে (সাঃ) বাণিজ্যিক পণ্য সিরিয়া নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে পাঠালেন এবং জানালেন যে, যদি এতে সম্মত হন তাহলে তিনি তাঁকে ভালভাবেই স্মরণ রাখবেন।

প্রিয় নবী (সাঃ) সে সময় তাঁর চাচা আবু তালিবের অভিভাবকত্বে ছিলেন। তিনি মাঝে মধ্যে হযরত খাদিজার (রাঃ) ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে অবহিত হতেন। 

খাদিজা রাঃ এর সাথে মুহাম্মদ সাঃ এর ব্যবসায়িক চুক্তি 

তিনি (সাঃ) হযরত খাদিজার প্রস্তাব মঞ্জুর করলেন এবং বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে বসরা রওয়ানা হয়ে গেলেন। রওয়ানার প্রাক্কালে হযরত খাদিজা(রাঃ) নিজের বিশেষ গোলাম মাইছারাহকে হুজুরের (সাঃ) সঙ্গে দিলেন এবং তাকিদ দিয়ে বলে দিলেন যে, সফরকালে যেন তাঁর কোন কষ্ট না হয়।

রাসুলুল্লাহর (সাঃ) দিয়ানতদারী বা বিশ্বস্ততা এবং সুন্দর আচরণের বদৌলতে সকল পণ্য দ্বিগুণ লাভে বিক্রি হয়ে গেল। সফরকালে কাফেলা সরদার অর্থাৎ প্রিয় নবী (সাঃ) সাথী বা সতীর্থদের সাথে এমন সুন্দর আচরণ করলেন যে, সকলেই তাঁর প্রশংসাকারী এবং জীবন উৎসর্গকারী হয়ে গেল। 

খাদিজা রাঃ এর পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব 

কাফেলা যখন মক্কা ফিরে এলো তখন হযরত খাদিজা (রাঃ) মাইছারাহর মুখে সফরের বর্ণনা ও লাভের বিস্তারিত তথ্য শুনতে পেয়ে অত্যন্ত প্রভাবান্বিত হলেন এবং নিজের দাসী নফিসার মাধ্যমে হুজুরের (সাঃ) নিকট বিয়ের পয়গাম প্রেরণ করলেন। হুজুরের (সাঃ) ইঙ্গিত পেয়ে সে . হযরত খাদিজার (রাঃ) চাচা আমর বিন আসাদকে ডেকে আনলো। সে সময় তিনিই ‘তাঁর অভিভাবক ছিলেন।

অন্যদিকে সারওয়ারে আলম (সাঃ) নিজের চাচা আবু তালিব এবং বংশের অন্যান্য গণ্যমান্যদেরকে সঙ্গে নিয়ে হযরত খাদিজার (রাঃ) বাড়ী তাশরীফ নিলেন। হযরত আবু তালিব বিয়ের খুতবা পড়লেন এবং পাঁচ'শ দিরহাম মোহর নির্ধারিত হলো। সে সময় প্রিয় নবীর (সাঃ) বয়স ছিল ২৫ বছর এবং হযরত খাদিজার (রাঃ) বয়স ছিল ৪০ বছর।

খাদিজা রাঃ এর কাহিনী - মুহাম্মদ সাঃ এর নবুয়্যাত প্রাপ্তি 

হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী


বিয়ের পর হুজুর (সাঃ) প্রায়ই ঘরের বাইরে কাটাতে লাগলেন। একাধারে কয়েকদিন মক্কার পাহাড়ে গিয়ে আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। মোট কথা, এভাবেই ১০টি বছর কেটে গেল। একদিন এমনিভাবেই প্রিয় নবী (সাঃ) হেরা পর্বতের গুহায় এবাদাতে ব্যাপৃত ছিলেন। আল্লাহর নির্দেশে জিবরিল আমিন (আঃ ) তাঁর নিকট আবির্ভূত হলেন এবং বললেন, কুম ইয়া মুহাম্মাদ।' অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ। দাঁড়াও। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) দৃষ্টি ওপরের দিকে ওঠালেন। এ সময় তিনি সামনে নুরানী চেহারার একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলেন। তাঁর মাথায় কালেমায়ে তাইয়েবা খচিত ছিল। জিবরিল আমিন (আঃ) হুজুরকে (সাঃ) গলা জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন এবং বললেন, পড়। হুজুর (সাঃ) বললেন, আমিতো লিখা-পড়া জানিনা। জিবরিল (আঃ) পুনরায় একই কথা বললেন এবং হুজুরও (সাঃ) একই জবাব দিলেন। তৃতীয়বার যখন জিবরিল (আঃ) বললেনঃ

“পড়ুন (হে রাসুল) আপনার রবের নাম নিয়ে।"

জিবরিল (আঃ) যা বললেন হুজুরের (সাঃ) পবিত্র মুখ দিয়েও একই কথা বেরিয়েএলো।

এই আশ্চর্যজনক ঘটনায় রাসুলের (সাঃ) ওপর সীমাহীন প্রভাব পড়লো। বাড়ী ফিরে বললেন, আমাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে আমাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দাও।” হযরত খাদিজা (রাঃ) নির্দেশ পালন করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, " আপনি কোথায় ছিলেন? আমিতো চিন্তিত হয়ে কয়েকজনকে আপনার সন্ধানে পাঠিয়েছি।” প্রিয় নবী (সাঃ) সকল ঘটনা হযরত খাদিজার (রাঃ) নিকট হুবহু বর্ণনা করলেন। হযরত খাদিজা (রাঃ) বললেন, “ আপনি সত্যি কথা বলে থাকেন, গরীবদের সাহায্য করেন, অতিথিপরায়ণ, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেন, আমানতদার এবং দুঃখী মানুষের খোঁজ-খবর আপনি নেন। 

আল্লাহ আপনাকে একাকী ছেড়ে দেবেননা।” অতঃপর রাসুলকে (সাঃ) সঙ্গে নিয়ে নিজের চাচাতো ভাই ওয়ারকাহ বিন নাওফলের নিকট গেলেন। জাহেলী যুগে এই ওয়ারকাহ মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করে খৃস্টান হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন তাওরিত, যাবুর ও ইনজিলের একজন বড় আলেম। 

বিবি খাদিজা (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) সাথে সংঘটিত সকল ঘটনা তাঁর সামনে বর্ণনা করলেন। ওয়ারকাহ ঘটনা শুনতেই বলে উঠলেনঃ

*এতো সেই জিবরিল (আঃ) যিনি মুসার (আঃ) ওপর অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আফসোস। আমি যদি সেই সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম, যখন আপনার কওম আপনাকে স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করবে।”

হুজুর (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, “এইসব মানুষ কি আমাকে বহিষ্কার করবে?” ওয়ারকাহ বললেন, “হাঁ, আপনার ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা কারোর ওপর অবতীর্ণ হলে দুনিয়া তাঁর বিরোধী হয়ে যায়। আমি যদি সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহলে আপনাকে আমি পুরোপুরি সাহায্য করবো।”

এই আলোচনার পর খুব শিগগিরই ওয়ারকাহ পরলোকগমন করেছিলেন তবুও হযরত খাদিজার (রাঃ) পূর্ণ আস্থা জন্মেছিল যে, হুজুর (সাঃ) রিসালতের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন। 

মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিনী

বস্তুত তিনি নির্দ্বিধায় হুজুরের (সাঃ) ওপর ঈমান আনলেন। সকল চরিতকারই ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারিনী হলেন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ)।

খাদিজা রাঃ এর ইসলাম গ্রহণের প্রভাব

হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলের (সাঃ) সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও ইসলামের স্পন্দন সৃষ্টি হয়। যুবকদের মধ্যে হযরত আলী কাররামাল্লাহ ওয়াজহাহু, বয়স্কদের মধ্যে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এবং হযরত যায়েদ (রাঃ) বিন হারেছাহ সর্বপ্রথম ঈমান আনেন। তাঁদের পর অন্যান্য সুন্দর স্বভাবের লোকও আস্তে আস্তে ইসলাম গ্রহণ শুরু করেন।

আরো পড়ুন: হযরত আয়েশা রাঃ এর জীবনী

খাদিজা রাঃ এর ত্যাগ ও কুরবানী 

প্রিয় নবীর (সাঃ) সঙ্গে বিয়ের পর হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ) প্রায় ২৫ বছর (অর্থাৎ ওহি নাযিলের প্রায় ৯ বছর পর পর্যন্ত) জীবিত ছিলেন। এই সময় তিনি রাসুলের (সাঃ) সঙ্গে প্রত্যেক ধরনের অন্তর কম্পিত করা মুসিবত হাসিমুখে বরদাশত এবং প্রিয় নবীর (সাঃ) বন্ধুত্ব ও জীবন উৎসর্গের হক আদায় করেন।

এমনকি নবুয়ত প্রাপ্তির সাত বছর পর কোরেশ মুশরিকরা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবকে শে'বে আবি তালিবে অবরোধ করে। এই বিপদের সময় হযরত খাদিজাও (রাঃ) রাসুলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গে ছিলেন। অবরোধের পুরো তিনটি বছর অবর্ণনীয় দুঃখ- কষ্ট তিনি সাহসিকতার সাথে বরদাশত করেন।

ইসলামের ব্যাপকতায় হযরত খাদিজা (রাঃ) খুবই আনন্দিত হতেন এবং তিনি অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ ও উপহাসকে উপেক্ষা করে নিজেকে হকের তাবলীগে রাসূলের (সাঃ) দক্ষিণ হস্ত হিসেবে প্রমাণ করতে লাগলেন। তিনি সমস্ত ধন-সম্পদ ইসলামের জন্য ও এতিম-বিধবাদের উন্নতি, অসহায়দের সাহায্য ও অভাবগ্রস্তদের অভাব দূরীকরণে ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। এদিকে কোরেশ কাফেররা নও-মুসলিমদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছিল এবং হকের তাবলীগের পথে সব ধরনের বাধা আরোপ করছিল। তারা প্রিয় নবী (সাঃ) এবং তাঁর অনুসারীদের ওপর নির্যাতন চালানোর প্রশ্নে সামান্যতম কুণ্ঠাও প্রকাশ করেনি।

কাফেরদের অর্থহীন এবং বাজে কথায় যখন রাসূলের হৃদয়তন্ত্রী দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতো তখন খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ) আরজ করতেনঃ “ ইয়া রাসুলাল্লাহ। আপনি দুঃখিত হবেন না। এমন কোন রাসূল কি আজ পর্যন্ত আগমন করেছেন, যাঁকে নিয়ে মানুষ উপহাস করেনি।” হযরত খদিজার (রাঃ) এই কথায় হুজুরের (সাঃ) দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যেত। মোট কথা, সেই দুর্যোগপূর্ণ দিনে হযরত খাজিদাতুল কুবরা (রাঃ) শুধুমাত্র রাসুলের (সাঃ) হামখেয়াল এবং দুঃখের ভাগীদারই ছিলেন না। বরং প্রতিটি আপদ-বিপদে তাঁকে সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকতেন।

প্রিয় নবী (সাঃ) বলতেনঃ “ আমি যখন কাফেরদের নিকট থেকে কোন কথা শুনতাম এবং আমার নিকট অসহনীয় মনে হতো তখন আমি তা খাদিজাকে (রাঃ) বলতাম। সে আমাকে এমনভাবে সাহস যোগাতো যে আমার অন্তর শান্ত হয়ে যেত। আর এমন কোন দুঃখ ছিল না যা খাদিজার (রাঃ) কথায় আসান এবং হাল্কা হতো না।”

আফিফ কিন্দী বর্ণনা করেছেন, জাহেলী যুগে একবার আমি কিছু দ্রব্য ক্রয়ের জন্য মক্কা এসেছিলাম এবং আব্বাস (রাঃ) বিন আব্দুল মুত্তালিবের নিকট অবস্থান করেছিলাম। পরের দিন সকালে আব্বাসের (রাঃ) সাথে বাজারের দিকে গেলাম। যখন কাবার নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলাম তখন এক যুবক সেখানে এলো। সে নিজের মাথা আসমানের দিকে উঁচু করে দেখলো এবং কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সেখানে একটি কিশোর এলো এবং প্রথম যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। এর সামান্য পর একজন মহিলা এলো এবং সেও সেই দু'জনের পিছনে দাঁড়িয়ে গেল। এই তিনজন নামায পড়লো এবং চলে গেল। আমি আব্বাস (রাঃ)কে জিজ্ঞাসা করলাম, “আব্বাস। মক্কায় বিপ্লব আসছে বলে অনুমিত হচ্ছে।” আব্বাস (রাঃ) বললেন, "হ্যা, এই তিনজন কে তা কি তুমি জানো?” আমি বললাম, “না।” আব্বাস (রাঃ) বললেন, “এই যুবক এবং কিশোর উভয়েই আমার ভ্রাতুষ্পুত্র। যুবকটি হলো আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং কিশোরটি হলো আবু তালিব বিন আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র আলী (রাঃ)। যে মহিলা উভয়ের পিছনে নামায পড়লো সে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদের (সাঃ) স্ত্রী এবং খুয়ায়েলদের কন্যা খাদিজা (রাঃ)। আমার ভ্রাতুষ্পুত্রের দাবী হলো, তার দ্বীন ইসহামী দ্বীন এবং সে খোদার হুকুমে প্রত্যেক কাজ করে থাকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই তনিজন ছাড়া অন্য কেউ এই দ্বীনের অনুসারী আছে বলে আমার জানা নেই।” আব্বাসের (রাঃ) এই কথা শুনে আমার অন্তরে সাধ জাগলো যে, হায়। আমি যদি চতুর্থ ব্যক্তি হতাম ৷

এই ঘটনায় অনুমান করা যায় যে, কি প্রতিকূল অবস্থায় হযরত খাদি (রাঃ) প্রিয় নবীকে (সাঃ) সহযোগিতা করেছিলেন।

খাদিজা রাঃ এর গর্ভে হযরত মোহাম্মদ সাঃ এর সন্তানদের নাম

হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) পেটে আল্লাহ পাক হুজুরকে (সাঃ) ৬টি পুত্র ও কন্যা সন্তান দিয়েছিলেন। সর্বপ্রথম কাসেম ভূমিষ্ঠ হন। তিনি শৈশবকালেই ইস্তেকাল করেন। অতঃপর যয়নব (রাঃ), তারপর আব্দুল্লাহ। তিনিও ছোট বয়সেই মারা যান (তাঁর উপাধি ছিল তাইয়েব এবং তাহের)। অতঃপর রোকাইয়া (রাঃ) । এরপর উম্মে কুলসুম (রাঃ) এবং তারপর ফাতিমাতুজ যোহরা (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন।

খাদিজা রাঃ এর প্রতি রাসুল সা. এর ভালবাসা

হযরত খাদিজার (রাঃ) এই হামদরদি, আন্তরিকতা ও জীবন উৎসর্গের কারণেই প্রিয় নবী (সাঃ) তাঁকে সীমাহীন ভালোবাসতেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন ততদিন হুজুর (সাঃ) দ্বিতীয় বিয়ে করেননি।

হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) ইন্তেকালের পরও তাঁর প্রতি প্রিয় নবীর (সাঃ) গভীর ভালোবাসা বিদ্যমান ছিল। যখন কোন কুরবানী করতেন তখন প্রথম হযরত খাদিজার (রাঃ) বান্ধবীদেরকে গোশত প্রেরণ করতেন এবং পরে অন্যদেরকে দিতেন। হযরত খাদিজার (রাঃ) কোন আত্মীয় তাঁর নিকট এলে তিনি তাদের খুব যত্ন করতেন।

হযরত খাদিজা (রাঃ) অত্যন্ত সুন্দরভাবে সস্তানদের লালন-পালন, সুষ্ঠুভাবে সাংসারিক কাজ এবং সম্পদ ও বিত্তশালী হওয়া সত্ত্বেও প্রিয় নবীর (সাঃ) খিদমত স্বহস্তে করতেন। সহিহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত জিবরাইল (আঃ) হুজুরের (সাঃ) এর নিকট তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, “খাদিজা বরতনে বা পাত্রে কিছু আনছেন। আপনি তাঁকে আল্লাহ এবং আমার সালাম পৌঁছে দেবেন।”

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতি হযরত খাদিজার (রাঃ) এত গভীর ভালোবাসা ও আস্থা ছিল যে, নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে এবং পরে হুজুর (সাঃ) যা কিছু বলেছেন সব সময় তিনি তা জোরের সাথে সমর্থন ও সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এজন্য হুজুর (সাঃ) তাঁর সীমাহীন প্রশংসা করতেন।

হযরত খাদিজা রাঃ এর মৃত্যু

নবুয়ত প্রাপ্তির দশম বছরে নির্যাতনমূলক অবরোধ শেষ হয়। কিন্তু তারপর হযরত খাদিজা (রাঃ) বেশী দিন জীবিত ছিলেন না। পবিত্র রমযানে অথবা তার কিছুদিন পূর্বে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রিয় নবী (সাঃ) তাঁর চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রুষাতে কোনো কমতি করেননি। হায়। মৃত্যুর তো কোন চিকিৎসা নেই । 

নবুয়তের ১০ম বছরের ১১ই রমযান তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে যাত্রা করলেন। মক্কার হাজুন নামক কবরস্তানে তাঁর লাশ দাফন করা হলো। সে সময় তাঁর বয়স প্রায় ৬৫ বছর ছিল।

তাঁর ওফাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সীমাহীন দুঃখ পেলেন। হযরত সাওদা'র (রাঃ) সঙ্গে বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রায় সময়েই বিষণ্ণ থাকতেন।

খাদিজা রাঃ এর জানাজা

ইসলাম ধর্মে তখনো জানাজা নামাজের বিধান চালু হয়নি। এমনি এক সময়ে হযরত খাদিজা রাঃ মৃত্যু বরণ করেন। তো খাদিজা রাঃ মক্কায় ইন্তেকাল করার পর তাকে জানাজা ব্যতিত দাফন করা হয়।

খাদিজা রাঃ এর কিছু প্রশংসা

হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) তিরোধানের পর একটি সময় পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ততক্ষণ ঘর থেকে বাইরে বেরুতেন না যতক্ষণ হযরত খাদিজার (রাঃ) প্রশংসা না করতেন। এমনিভাবে যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন তাঁর উল্লেখ করে অনেক প্রশংসা করতেন। 

হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) প্রশংসায় বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণিত আছে।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) বলেন, একবার হুজুর (সাঃ) যথারীতি খাদিজাতুল কুবরার তারিফ শুরু করলেন। আমার ঈর্ষা হলো। আমি বললাম," ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি একজন বৃদ্ধা বিধবা মহিলা ছিলেন। খোদা তাঁর পর আপনাকে তাঁর থেকে উত্তম স্ত্রী দিয়েছেন।” এ কথা শুনে হুজুরের (সাঃ) চেহারা মুবারক ক্রোধে লাল হয়ে গেল এবং বললেনঃ

“আল্লাহর কসম। আমি খাদিজা (রাঃ) থেকে ভালো স্ত্রী পাইনি। ,,,,,,,”

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবং সেই দিনই প্রতিজ্ঞা করলাম যে, ভবিষ্যতে হুজুরের (সাঃ) সামনে কখনো খাদিজাতুল কুবরাকে (রাঃ) এমন তেমন বলবো না ।

খাদিজা রাঃ সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন:

হযরত খাদিজা রাঃ সম্পর্কে বহুল আলোচিত প্রশ্নগুলোর উত্তর নিচে দেয়া হল। 

খাদিজা রাঃ এর প্রথম স্বামীর নাম কি

বয়োপ্রাপ্ত হলে আবু হালাহ হিন্দ বিন নাবাশ তামিমীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। আবু হালাহর ঘরে তাঁর দু'টি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল।

খাদিজা রাঃ এর চাচার নাম কি

ওরাকা বিন নওফেল তিনি খাদিজা রাঃ এর সম্মানিত চাচা।

হযরত খাদিজা রাঃ এর উপাধি কী ছিল

হযরত খাদিজা রাঃ কে তাহেরা উপাধিতে ভূষিত করা হত।

মোহরানা হিসাবে রাসুল (সাঃ) খাদিজা (রাঃ) কে কয়টি উট দিয়েছিলেন ?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে খাদিজা রাঃ এর বিবাহের মোহরানার পরিমাণ হলো ৫০০ স্বর্ণ মুদ্রা

খাদিজা রাঃ কি বিধবা ছিলেন?

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা রাঃ কে বিবাহের সময় তিনি বিধবা ছিলেন।

পরিশেষে

সম্মানিত পাঠক!

পুরো আর্টিকেলে আমরা মহিয়সি হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আশাবাদী আপনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জানতে পেরেছেন।

যদি আর্টিকেল টি আপনাদের উপকারে আসে তাহলে এটি আপনাদের বন্ধুদের মাঝে বেশি বেশি শেয়ার করুন।

Next Post
No Comment
Add Comment
comment url