হযরত আয়েশা রাঃ এর জীবনী। জন্ম মৃত্যু এবং ইফকের ঘটনা সহ সমস্ত কিছু। Alfamito Blog

হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা  মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতায় যেন তিনি অতুলনীয়। ইসলামী বিধি বিধানে তার রয়েছে বিরাট অবদান কেউ কেউ বর্ণনা করেন ইসলামী হুকুম আহকামের এক তৃতীয় অংশ তার থেকে বর্ণিত। আজ আমরা হযরত আয়েশা রা. এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করব।হযরত আয়েশা রাঃ এর জীবনী

হযরত আয়েশা রা  সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য

প্রশ্ন উত্তর
নাম আয়েশা
কুনিয়ত উম্মে আব্দুল্লাহ
লকব সিদ্দিকাহ
বংশধারা আয়েশা বিনতে আবুবকর সিদ্দিক বিন আবি কাহাফা বিন আমের বিন আমর বিন কা'ব বিন সা'দ বিন তাইম বিন মাররাহ বিন কা'ব বিন হুরী।
পিতা আবু বকর সিদ্দিক রা.
মাতা উম্মে রুমান (রাঃ) বিনতে আমের
জন্ম নবীর (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির চার বছর পর শওয়াল
মৃত্যু ৫৮ হিজরীর রমযান মাস

হযরত আয়েশা রাঃ এর জীবনী 

নাম আয়েশা। লকব সিদ্দিকাহ এবং হোমায়রা। উম্মে আব্দুল্লাহ কুনিয়ত। কোরেশের বনু তাইম খান্দানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন। 

নসবনামা হলো: আয়েশা (রাঃ) বিনতে আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) বিন আবি কাহাফা (রাঃ) বিন আমের বিন আমর বিন কা'ব বিন সা'দ বিন তাইম বিন মাররাহ বিন কা'ব বিন হুরী।

হযরত আয়েশা রাঃ এর জন্ম ও মাতা পিতা

মাতার নাম ছিল উম্মে রুমান (রাঃ) বিনতে আমের এবং তিনিও ছিলেন জালিলুল কদর সাহাবীয়াহ। নবীর (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির চার বছর পর শওয়াল মাসে হযরত আয়েশা (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন।

হযরত আয়েশা রাঃ এর শৈশবকাল

হযরত আয়েশার (রাঃ) শৈশবকাল কেটেছিল সিদ্দিকে আকবরের (রাঃ) মত জালিলুল কদর সাহাবার ছায়াতলে। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন সীমাহীন মেধাসম্পন্ন এবং শৈশবকালের সকল কথাই তাঁর স্মরণ ছিল। বলা হয়ে থাকে যে, অন্য কোন সাহাবী অথবা সাহাবীয়ার এত স্মরণ শক্তি ছিল না ।

শৈশবকালে একবার হযরত আয়েশা (রাঃ) খেলনা নিয়ে খেলা করছিলেন। এ সময় প্রিয় নবী (সাঃ) নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। শিশু আয়েশার (রাঃ) খেলনার মধ্যে পাখা বিশিষ্ট একটি ঘোড়াও ছিল। হুজুর (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, “আয়েশা। এটা কি?” তিনি জবাব দিলেন, “ ঘোড়া।” হুজুর (সাঃ) বললেন, " ঘোড়ার তো পাখা হয় না।” তিনি নির্দ্বিধায় জবাব দিলেন, “ ইয়া রাসূলাল্লাহ! কেন হবে না। হযরত সোলায়মানের (আঃ) ঘোড়ার তো পাখা ছিল।” হুজুর (সাঃ) এই জবাব শুনে মুচকি হেসেদিলেন।

ইমাম বুখারী (রঃ) বর্ণনা করেছেন, যখন

بل الساعة موعدهم والساعة أدلى وآمر (سورة قمر

- ছিলেন।

মক্কায় অবতীর্ণ হলো তখন হযরত আয়েশা (রাঃ) খেলাধূলায় মশগুল। 

মুহাম্মাদ সাঃ এর সাথে আয়েশা (রাঃ) এর বিবাহ 

হুজুরের (সাঃ) এর পূর্বে হযরত আয়েশার (রাঃ) সম্পর্ক জাবির বিন মাতয়ামের পুত্রের সঙ্গে স্থির হয়েছিল। কিন্তু জাবির মায়ের ইঙ্গিতে এই সম্পর্ক বাতিল করে দেয়। কেননা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এবং তাঁর পরিজন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এরপর হযরত খাওলা (রাঃ) বিনতে হাকিমের উদ্যোগে হুজুর (সাঃ) হযরত আবুবকর সিদ্দিককে (রাঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) জন্য পয়গাম প্রেরণ করলেন। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) রাসূলে করিমের (সাঃ) মুখে ডাকা ভাই ছিলেন। তিনি তাজ্জব হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ ভাইয়ের কন্যার সঙ্গে কি বিয়ে হয় ?” খাওলা (রাঃ) এ কথা হুজুরকে (সাঃ) জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, “ আবুবকর (রাঃ) আমার দ্বীনি ভাই। এ ধরনের ভাইদের সন্তানদের সঙ্গে বিয়ে জায়েজ আছে।” হযরত সিদ্দিকে আকবরের (রাঃ) এর চেয়ে বড় খুশী আর কি ছিল যে, তাঁর কন্যার বিয়ে হবে রাসূলের (সাঃ) সঙ্গে। তিনি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলেন। বস্তুত হিজরতের তিন বছর আগে শওয়াল মাসে ৬বছর বয়সে রাসূলের (সাঃ) সঙ্গে হযরত আয়েশার (রাঃ) বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) স্বয়ং বিয়ে পড়ালেন। পাঁচশ' দিরহাম মোহর নির্ধারিত হলো।

হুজুর (সাঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) সঙ্গে বিয়ের সুসংবাদ স্বপ্নে লাভ করেছিলেন। তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, এক ব্যক্তি রেশমে লেপ্টানো কোন বস্তু তাঁকে প্রদর্শন করছে এবং বলছে, “এই বস্তু আপনার।" তিনি তা খুলে হযরত আয়েশাকে (রাঃ)পেয়েছিলেন।

খুব সাদাসিধাভাবে হযরত আয়েশার (রাঃ) বিয়ে হয়েছিল। তিনি বলেনঃ *রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন আমাকে বিয়ে করেন তখন আমি সঙ্গীদের সঙ্গে খেলা করতাম! আমি এ বিয়ে সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ইত্যবসরে আমার পিতা 'আমাকে বাইরে বেরুনো নিষেধ করে দিলেন।

একটি ভ্রান্তির দূরীকরণ শাওয়াল মাস অপয়া মাস 

একবার শাওয়াল মাসে আরবে প্লেগ রোগ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছিল। এই রোগে হাজার হাজার পরিবার বিরান হয়ে গিয়েছিল। সে সময় থেকে আরববাসীর নিকট শাওয়াল মাস অপয়া মাস হিসেবে বিবেচিত হতো এবং তারা এ মাসে আনন্দ-উৎসব করতে অনীহা প্রকাশ করতো। হযরত আয়েশার (রাঃ) বিয়েও শওয়াল মাসে সম্পন্ন হয়েছিল এবং কয়েক বছর পর কন্যা বিদায়ও শওয়াল মাসেই হয়েছিল। সেই সময় থেকে শওয়াল মাস অপয়া হওয়ার চিন্তা মানুষের অন্তর থেকে দূর হয়।

হযরত আয়েশার (রাঃ) এর হিজরত

হযরত আয়েশার (রাঃ) এর হিজরত


হযরত আয়েশার (রাঃ) সঙ্গে বিয়ের তিন বছর পর রহমতে আলম (সাঃ) হযরত আবুবকরকে (রাঃ) সাথে নিয়ে হিজরত করে মদীনা তাশরীফ নেন। মদীনা পৌছে প্রিয় নবী (সাঃ) এবং হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) পরিবার-পরিজন আনার জন্য হযরত যায়েদ (রাঃ) বিন হারেছা, আবু রাফে (রাঃ) এবং আবদুল্লাহ বিন আরিকতকে মক্কা প্রেরণ করেন। যখন তাঁরা ফিরে এলেন তখন হযরত যায়েদ (রাঃ) বিন হারেছার সঙ্গে ছিলেন হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ),হযরত উম্মে কুলছুম (রাঃ), হযরত ছাওদা (রাঃ) বিনতে যামাআ, উম্মে আইমান (রাঃ) এবং উসামা(রাঃ)বিন যায়েদ (রাঃ)। অন্যদিকে আবদুল্লাহ বিন আরিকতের সঙ্গে ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন আবি বকর (রাঃ), উম্মে রুমান (রাঃ), আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) এবং আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ)।

মদীনা পৌঁছে হযরত আয়েশা (রাঃ) বনু হারেছের মহল্লায় অবস্থিত শ্ৰদ্ধেয় পিতার গৃহে অবতরণ করলেন। প্রথম দিকে মদীনার আবহাওয়া মুহাজিরদের সহ্য হলো না। হযরত আবুবকর সিদ্দিক রা. কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করলেন। যখন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) সুস্থ হয়ে উঠলেন তখন তিনি স্বয়ং অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুখও এত কঠিন ছিল যে, মাথার চুল পড়ে গেল। এ সত্ত্বেও জীবনে বেঁচে গেলেন যখন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হলো।

মুহাম্মাদ সা আয়েশাকে (রাঃ) উঠিয়ে নেওয়া 

সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) তখন নিকট আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলূল্লাহ। আয়েশাকে (রাঃ) আপনি উঠিয়ে নেন না কেন ? রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, " বর্তমানে আমার নিকট মোহর নেই।” সিদ্দিকে আকবর (রাঃ) নিজের নিকট থেকে পাঁচশ দিরহাম হুজুরের (সাঃ) খিদমতে করজে হাসানা হিসেবে পেশ করলেন। এই অর্থ তিনি গ্রহণ করলেন এবং হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট তা প্রেরণ করে প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে তাঁকে তুলে নিলেন। সে সময় হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহর (রাঃ) বয়স ছিল ১ বছর। অন্য রেওয়ায়েতে ১২ বছর বলা হয়েছে।

হযরত আয়েশা রাঃ উহুদ যুদ্ধ ও সাহসিকতা

তৃতীয় হিজরীতে ওহোদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একটি ভুলের কারণে যখন যুদ্ধের দৃশ্য পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং হুজুরের (সাঃ) শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়লো তখন মদীনা থেকে হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ), হযরত ছুফিয়া (রাঃ), সাইয়েদাতুন নিসা ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) এবং অন্য মুসলমান মহিলারা পাগলিনীর মত যুদ্ধের ময়দানের দিকে এগিয়ে গেলেন। সেখানে পৌঁছে হুজুরকে (সাঃ) সহি সালামত দেখে শুকরিয়ার সিজদা আদায় করলেন। তাঁরা সকলে মিলে রাসূলের (সাঃ) ক্ষতস্থান পরিষ্কার করলেন এবং মশক ধরে ক্ষতস্থানে পানি ঢাললেন। এদিক ওদিক বিশৃংখল অবস্থায় অবস্থানরত সাহাবীরা যখন হুজুরের (সাঃ) চারপাশে একত্রিত হওয়া শুরু করলেন তখন তাঁরা মদীনা ফিরে গেলেন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রঃ) লিখেছেন, হযরত আয়েশা (রাঃ) খন্দকের বা পরিখার যুদ্ধেও দুর্গের বাইরে বেরিয়ে যুদ্ধের চিত্র দেখতেন। রাসূলের (সাঃ) নিকট অন্যান্য যুদ্ধেও অংশগ্রহণের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু অনুমতি পাননি। সহিহ বুখারীতে আছে, তিনি রাতে ঘুম থেকে উঠে কবরস্তানে চলে যেতেন। এইসব রাওয়ায়েতে প্রমাণিত হয় যে, উম্মুল মুমিনিন প্রকৃতিগতভাবে অত্যন্ত সাহসী এবং ভয়হীনছিলেন।

আয়েশা রাঃ এর প্রতি হুজুর সা. এর ভালবাসা

প্রিয় নবী (সাঃ) হযরত আয়েশাকে (রাঃ) সীমাহীন ভালোবাসতেন। মুসনাদে আবু দাউদে বর্ণিত আছে, হুজুর (সাঃ) বলতেন, “ হে আল্লাহ! এমনিতেই তো আমি সকল স্ত্রীর সঙ্গে সমান ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু অন্তর আমার আয়ত্তের বাইরে।

অন্তর আয়েশাকেই (রাঃ) বেশী ভালবাসে। হে আল্লাহ! তুমি অন্তরকে ক্ষমা করে দিও।”

প্রিয় নবী (সাঃ) পবিত্রতার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতেন এবং নিজের মেসওয়াক বার বার ধৌত করাতেন। এই খিদমতের দায়িত্ব হযরত আয়েশার (রাঃ) ওপরই ন্যস্ত ছিল।

হযরত আয়েশা রাঃ এর ত্যাগ

হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রিয় নবীর (সাঃ) ওপর জীবন বাজি রাখতেন। একবার হুজুর (সাঃ) রাতের বেলায় ঘুম থেকে উঠে কোথাও গেলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) চক্ষু খুললেন এবং রাসুলকে (সাঃ) না দেখে খুব পেরেশান হলেন। পাগলিনীর মত উঠলেন এবং এদিক ওদিকে অন্ধকারের মধ্যে তালাশ করতে লাগলেন। অবশেষে এক স্থানে হুজুরে (সাঃ) কদম মুবারক নজরে এলো। তিনি দেখলেন যে, হুজুর (সাঃ) সিজদারত অবস্থায় আল্লাহর স্মরণে মশগুল আছেন। এই সময় তিনি দুশ্চিন্তামুক্ত হলেন।

একবার হুজুর (সাঃ) কম্বল গায়ে দিয়ে মসজিদে তাশরিফ আনলেন। একজন সাহাবী আরজ করলেনঃ “ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতে দাগ দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয়। ” তিনি তা গোলামের হাতে হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট পাঠিয়ে দিলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) পানি আনলেন। নিজের হাতে সেই দাগ ধুলেন। এরপর কম্বল শুকিয়ে রাসূলের (সাঃ) খিদমতে ফেরত পাঠালেন।

প্রিয় নবী (সাঃ) যখন ইহরাম বাঁধতেন অথবা ইহরাম খুলতেন তখন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) শরীরে খোশবু লাগিয়ে দিতেন।

একবার সফরে হযরত আয়েশার (রাঃ) হার হারিয়ে গেল। হুজুর (সাঃ) তা অনুসন্ধানে কতিপয় সাহাবীকে প্রেরণ করলেন। তাঁরা হার অনুসন্ধানে বের হলেন রাস্তায় নামাযের সময় হলো। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত পানি ছিল না। এজন্য তাঁরা ওজু ছাড়াই নামায পড়লেন। ফিরে এসে তাঁরা রাসূলের (সাঃ) নিকট ঘটনা বর্ণনা করলেন। এ সময় তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হলো। হযরত উসায়েদ (রাঃ) বিন হাজিয়া একে হযরত আয়েশার (রাঃ) বড় ফজিলত হিসেবে মনে করলেন এবং তাঁকে সম্বোধন করে বললেনঃ

উম্মুল মুমিনিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম জাযা দিন। আপনি এমন কোন ঘটনার সম্মুখীন হননি যা থেকে আপনি পরিত্রাণ পাননি এবং মুসলমানদের জন্য তা এক বরকত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।”

মুহাম্মাদ সা. এর ইন্তেকাল

হযরত আয়েশার (রাঃ) দাম্পত্য জীবনের ন'বছর পর প্রিয় নবী (সাঃ) মৃত্যু রোগে আক্রান্ত হলেন। তের দিন যাবত তিনি মৃত্যু শয্যায় ছিলেন। এই তের দিনের মধ্যে ৫ দিন তিনি অন্য স্ত্রীদের নিকট অবস্থান করেন এবং ৮ দিন ছিলেন হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট। কঠিন রোগের দুর্বলতার কারণে হুজুর (সাঃ) হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট মিসওয়াক দিতেন। তিনি নিজের দাঁত দিয়ে তা চিবিয়ে নরম করে দিতেন এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ব্যবহার করতেন।

১১ হিজরীর ৯ অথবা ১২ই রবিউল আউয়ালে সারওয়ারে কাওনাইনের (সাঃ) রুহ মুবারক আলমে কুদসের দিকে যাত্রা করলো। এ সময় হুজুরের (সাঃ) পবিত্র মাথা হযরত আয়েশার (রাঃ) এর বুকের ওপর রাখা ছিল এবং তাঁর হুজরা মুবারকেই চির শয়ানে শায়িত হন।

হযরত ওমর রা. এর ইন্তেকাল ও দাফন

হযরত ওমর ফারুকের (রাঃ) ওফাতের সময় যখন উপস্থিত হলো তখন তিনি নিজের পুত্র হযরত আব্দুল্লাহকে (রাঃ) উম্মুল মুমিনিনের (রাঃ) খিদমতে প্রেরণ করে তাঁকে রাসুলের (সাঃ) পাশে দাফন হওয়ার অনুমতি প্রর্থনা করলেন।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেনঃ “ আমার দাফনের জন্য এই স্থান রেখেছিলাম। কিন্তু ওমরের (রাঃ) খাতিরে আমি আজ তা থেকে হাত গুটিয়ে নিলাম।”

হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) এই নজিরবিহীন উদারতার কারণেই ফারুকে আযম (রাঃ) আজ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর পাশে শুয়ে আছেন ।

মুসলিম উম্মাহর মাঝে মতভেদ ও উষ্ট্রের যুদ্ধ 

হযরত ওমরের (রাঃ) পর হযরত ওসমান (রাঃ) খলিফা হলেন। তাঁর শাসনকালে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ভয়াবহ ফিতনা এবং ষড়যন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়ায় যার ফলশ্রুতিতে হযরত ওসমান গনির (রাঃ) শাহাদাতের দুঃখজনক ঘটনা সংঘটিত হয়। তিন দিনের ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর বার্দ্ধক্যে পীড়িত আমিরুল মুমিনিন (রাঃ)কে কুরআন মজিদ তিলাওয়াত অবস্থায় জালেমরা যে নির্দয়তার সাথে শহীদ করে তাতে হযরত আয়েশার (রাঃ) অন্তর খুন হয়ে গেল। 

বস্তুত চতুর্থ খলিফা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর শাসনামলে কতিপয় সাহাবী (রাঃ) এবং মুসলমানদের একটি দল ওসমানের (রাঃ) বদলা নেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। এই দলে হযরত যোবায়ের (রাঃ) বিন আওয়াম এবং হযরত তালহার (রাঃ) মত জালিলুল কদর সাহাবীও ছিলেন।

হযরত ওসমানের (রাঃ) শাহাদাতে হযরত আয়েশার (রাঃ) মনে নিদারুণ দুঃখ ছিল। এজন্য তিনি নেক নিয়তের সঙ্গে এই দলকে সমর্থন করেন। এই দলের ধারণা ছিল যে, ওসমান (রাঃ) হস্তাদের কতিপয় ব্যক্তি হযরত আলীর (রাঃ) আশ্রয়ে রয়েছে। ওদিকে হযরত আলীর (রাঃ) বক্তব্য ছিল, পূর্ণ তদন্তের পর যতক্ষণ পর্যন্ত হত্যাকারীদের সনাক্ত না করা হবে ততক্ষণ তাদের ওপর দন্ড জারি করা সম্ভব নয়। এই মতভেদের কারণে উষ্ট্রের যুদ্ধের মত দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল। হযরত আয়েশা (রাঃ) পরিস্থিতি শোধরানোর জন্য নিজের দলসহ বসরা গেলেন। 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানে হযরত আলীর (রাঃ) সঙ্গে যুদ্ধ বেধে গেল। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই ব্যাপক জীবন হানি ঘটলো। এ সত্ত্বেও হযরত আলী বিজয়ী হলেন। তিনি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে উন্মুল মুমিনিনকে (রাঃ) ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। যখনই হযরত আয়েশা (রাঃ)-

এই যুদ্ধের কথা স্মরণ হতো তখনই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন এবং বলতেনঃ “ হায়। ২০ বছর আগে যদি আমার মৃত্যু হতো।”

আরো পড়ুন: হযরত খাদিজা রাঃ এর জীবনী

হযরত আয়েশার (রাঃ) এর শাগরিদ

হযরত আয়েশার (রাঃ) এর প্রায় দুশ শাগরিদ বা শিষ্য ছিলেন। এইসব শিষ্যের মধ্যে কাসিম বিন মুহাম্মাদ (রাঃ) মাসরুক তাবেয়ী (রাঃ), আয়েশা বিনতে তালহা (রাঃ), আবুসালমা (রাঃ) এবং উরওয়াহ বিন যোবায়েরের (রাঃ) নাম প্রসিদ্ধ।

হযরত আয়েশা রা এর সন্তান।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহর (রাঃ) কোন সন্তান হয়নি। তিনি হুজুরের (সাঃ) ইরশাদ অনুযায়ী ভাগিনা হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়েরের (রাঃ) নামানুসারে নিজের কুনিয়ত রেখেছিলেন উম্মে আব্দুল্লাহ।”

হযরত আয়েশা রাঃ এর মৃত্যু

হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) ৫৮ হিজরীর রমযান মাসে ৬৭ বছর বয়সে ইস্তেকাল করেন। ওছিয়ত অনুযায়ী রাতে বিতরের নামাযের পর জান্নাতুল 'বাকি'তে তাঁকে দাফন করা হয়। হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) জানাযার নামায পড়ান। জানাযায় এত লোকের সমাগম হয়েছিল যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তাঁর ইন্তেকালে ইসলামী বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে।

হযরত আয়েশা রাঃ এর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সমূহ 

হযরত আয়েশা রাঃ এর ঘটনা সমূহ


হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহর (রাঃ) পবিত্র জীবনে চারটি ঘটনা অপরিসীম গুরুত্বের দাবীদার। এই চারটি ঘটনা হলোঃ ইফকের, ইলা, তাহরিম এবং তাখাইয়্যির।

ইফকের ঘটনা

ইফকের ঘটনা এভাবে সংঘটিত হয়েছিলঃ বনু মুসতালিকের যুদ্ধের সফরে হযরত আয়েশা (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) সফর সঙ্গী ছিলেন। রাস্তায় এক স্থানে রাতে কাফেলা অবস্থান করলো। হযরত আয়েশা (রাঃ) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য তাঁবু থেকে বের হয়ে দূরে চলে গেলেন। আসাবধানতাবশত গলার হার সেখানে পড়ে গেল। এ হার তিনি সহোদরা হযরত আসমার (রাঃ) নিকট থেকে চেয়ে এনেছিলেন। সেখান থেকে ফিরে যখন বুঝতে পারলেন যে, হারটি হারিয়ে গেছে তখন খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন। অতঃপ্ৰফিরে সেদিকে গেলেন। ধারণা করেছিলেন যে, কাফেলা রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই হারটি সন্ধান করে ফিরে আসতে পারবেন। যখন হার সন্ধান করে ফিরে এলেন তখন কাফেলা রওয়ানা হয়ে গেছে। তিনি খুব ঘাবড়ে গেলেন। অনভিজ্ঞতার বয়স। চাদর উড়িয়ে সেখানেই শুয়ে রইলেন। হযরত ছাফওয়ান (রাঃ) বিন মুয়াত্তাল নামক এক সাহাবী কোন ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রয়োজনে কাফেলার পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন। তিনি হযরত আয়েশাকে (রাঃ) চিনে ফেললেন। কেননা শৈশবে (অথবা পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে) তাঁকে দেখেছিলেন। তিনি তাঁকে পিছে পড়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। যখন ঘটনা জ্ঞাত হলেন তখন খুব হামদরদী প্রদর্শন করলেন। অতঃপর উন্মুল মুমিনিনকে (রাঃ) উটে বসিয়ে দ্রুত কাফেলার দিকে রওয়ানা হলেন এবং দ্বিপ্রহরের সময় কাফেলার সঙ্গে গিয়ে একত্রিত হলেন। নামকরা মুনাফিক আব্দুল্লাহ বিন উবাই যখন এই ঘটনার কথা জানতে পারলো তখন সে হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহর (রাঃ) ব্যাপারে রটিয়ে দিল যে তিনি আর এখন পবিত্র নেই। সাদাসিধে মনের কতিপয় মুসলমানও ভুল ধারণার শিকার হলেন। জনাব রাসূলে করিমও (সাঃ) প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) অন্যায় অপবাদের দুঃখে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। এ সময় আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটলো এবং পবিত্রতার আয়াত নাযিল হলোঃ

لولا اذا سمعتم و منَ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِالْفُهم

خداد قالوا هذا اقل من (سوره نور ) وَ

“যখন তোমরা এই ঘটনা শুনলে তখন মুমিন পুরুষ ও মহিলাদের সম্পর্কে সুন্দর ধারণা কেন পোষণ করনি এবং কেন বলনি যে এটা নীরেট অপবাদ।”

পবিত্রতার আয়াত নাযিল হওয়ার পর শত্রুদের মুখ কালো হয়ে গেল এবং সাদা মনের মুসলমান, যারা ভুল ধারণার শিকার হয়েছিলেন, তাঁরা খুব লজ্জিত হলেন। তাঁরা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের (সাঃ) নিকট ক্ষমা চাইলেন। আয়েশার (রাঃ) মাথা গৌরবে উঁচু হয়ে গেল। তিনি বললেন, আমার আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ এবং অন্য কারো নিকট কৃতজ্ঞ নই

আমি শুধু

তাহরিমের ঘটনা

তাহরিমের ঘটনাঃ প্রিয় নবীর (সাঃ) নিয়ম ছিল আছরের নামাযের পর স্ত্রীদের (রাঃ) নিকট কিছুক্ষণের জন্য গমন করতেন। একবার হযরত যয়নব (রাঃ) বিনতে জাহাশের নিকট বেশ দেরী হয়ে গেল। এতে হযরত আয়েশা (রাঃ) ঈর্ষান্বিত হলেন। তিনি গোপনে খোঁজ নিয়ে জানতে পেলেন যে, হুজুর (সাঃ) যয়নবের (রাঃ) নিকট থেকে মধু খেয়েছেন। এই মধু কেউ তাঁকে তোহফা হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত হাফছাকে (রাঃ) বললেন, যখন হুজুর (সাঃ) আমাদের এবং তোমাদের ঘরে তাশরীফ আনেন তখন বলতে হবে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি মাগাফিরের মধু খেয়েছেন (মাগাফির এক ধরনের ফুল। মৌমাছি এই ফুলে বসে মধু আহরণ করে। আর এ মধুতে সামান্য দুর্গন্ধ হয় এবং প্রিয় নবী (সাঃ) সব ধরনের দুর্গন্ধই অপছন্দ করতেন)। যখন হুজুর (সাঃ) বলবেন যে, যয়নব (রাঃ) মধু পান করিয়েছে তখন তোমরা বলবে, সম্ভবত এই মধু আরফতের মৌমাছির আহরিত মধু। যখন হুজুর (সাঃ) হযরত হাফছার (রাঃ) নিকট তাশরীফ নিলেন তখন এই সওয়াল-জওয়াব হলো। অতঃপর হযরত ছুফিয়া (রাঃ) ও হযরত আয়েশাও (রাঃ) একই কথার দ্বিরুক্তি করলেন। ফলে হুজুরের (সাঃ) মনে হলো তাঁর পবিত্র শরীরে কেমন যেন গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে। বস্তুত যখন তিনি পুনরায় হযরত যয়নবের (রাঃ) নিকট তাশরীফ নিলেন এবং তিনি নিয়মমত মধু পেশ করলেন তখন তিনি বললেন, “ তা আমার প্রয়োজন নেই। আমি ভবিষ্যতে মধু খাবো না।” এতে এই আয়াত নাযিল হলোঃ

يايها النبي لم تحرَمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْواجِكَ

“হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের সন্তুষ্টির জন্য যে বস্তু খোদা হালাল করেছেন, তা নিজের ওপর হারাম করেছেন কেন ?

ইলার ঘটনা

ইলার ঘটনাঃ পূত পবিত্র স্ত্রীদের জন্য খাদ্য ও খেজুরের যে পরিমাণ নির্ধারিত ছিল তা তাঁদের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না এবং তাঁরা অভাবের মধ্যে সময় কাটাতেন। এদিকে গনিমতের মাল ও বার্ষিক রাজস্ব আয় যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। সুতরাং পবিত্র স্ত্রীরা (রাঃ) নির্ধারিত জীবিকা বৃদ্ধির ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এবং হযরত ওমর ফরুক (রাঃ) নিজেদের কন্যাদ্বয় যথাক্রমে হযরত আয়েশা (রাঃ) ও হযরত হাফছাকে (রাঃ) বুঝিয়ে এই দাবী থেকে বিরত রাখলেন। কিন্তু অন্য স্ত্রীরা (রাঃ) ঐ দাবীর ওপর আটল রইলেন। ঘটনাক্রমে সেই সময় হুজুর (সাঃ) ঘোড়ার ওপর থেকে পড়ে যান এবং পাঁজরে আঘাত পান। তিনি হযরত আয়েশার (রাঃ) হুজরা সংলগ্ন ওপর তলায় এক কক্ষে অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং ওয়াদা করলেন যে, এক মাস পর্যন্ত স্ত্রীদের (রাঃ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন না। মুনাফিকরা এ ধরনের মওকারই সন্ধানে থাকতো। তারা রটিয়ে দিল যে, হুজুর (সা): স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। সকল সাহাবা এই খবর শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলেন। তিনি একটি চারপায়ীর ওপর শুয়ে ছিলেন এবং পবিত্র শরীরে রশির দাগ পড়ে গিয়েছিল। ফারুকে আযম (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) এই অবস্থা দেখে খুবই মনোকষ্ট পেলেন এবং আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়ে দিয়েছেন? “হুজুর (সাঃ) বললেন, “না”।

হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) এই সুসংবাদ সব লোককে শুনিয়ে দিলেন। এতে সকল মুসলমান এবং পূত-পবিত্র স্ত্রীদের (রাঃ) মধ্যে খুশীর ঢেউ বয়ে গেল।

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, “ আমি এক এক করে দিন গুণছিলাম। ২৯তম দিনে হুজুর (সাঃ) ওপর তলার কক্ষ থেকে নেমে সর্বপ্রথম আমার নিকট তাশরীফ আনলেন। আমি আরজ করলাম “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি এক মাসের ওয়াদী করেছিলেন। আর আজ ২৯ দিন। তিনি বললেন, * মাস কখনো ২৯ দিনেও হয়।

তাখাইয়্যিরের ঘটনা

তাখাইয়্যিরের ঘটনাঃ ইলার ঘটনার পর একদিন হুজুর (সাঃ) হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহর (রাঃ) নিকট তাশরীফ নিলেন এবং বললেন, “ আয়েশা, আমি তোমাকে একটি কথা জিজ্ঞেস করছি। তোমার মাতা-পিতার সাথে পরামর্শ করে যদি জবাব দাও তাহলে ভালো হবে।”

হযরত আয়েশা (রাঃ) আরজ করলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! কথাটি কি?” হুজুর (সাঃ) সুরায়ে আহারের এই আয়াত তিলাওয়াত করলেনঃ

ياتها النبي قل لأزواجِكَ إِن كُنت تُرِينَ الحَياةَ الدُّنْيادَ زِينَتَهَا فتعالين امتنان واسرعكن سَوَما جَمِيلاه وَإِن كُنت تُرِينَ

الله و رسوله والدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ اعَدَ لِلْحَنَتِ

منكن اجرا عظيماه

“হে নবী! আপনার স্ত্রীদেরকে বলে দিন, যদি তোমাদের পার্থিব জীবন এবং তার শোভা প্রয়োজন হয় তাহলে এসো আমি তোমাদেরকে কিছু দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেই এবং যদি তোমার আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের গৃহ ভালো মনে হয় তাহলে তোমাদের মধ্যে যে নেককার তার জন্য আল্লাহ বড় ছওয়াব নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।”

হযরত আয়েশা (রাঃ) আরজ করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল। এতে মাতা- পিতার সাথে পরামর্শের কি আছে! আমি তো আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং আখিরাতের ঘর এখতিয়ার করলাম।” হুজুর (সাঃ) এই উত্তর পছন্দ করলেন। এই কথা যখন অন্য স্ত্রীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন তখন তাঁরাও একই ধরনের জবাব দিলেন।

হযরত আয়েশা রাঃ এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

এ পর্বে আমরা আলোচনা করব হযরত আয়েশার রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহার বিশেষ কিছু কীর্তি সম্পর্কে এছাড়া আয়েশা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার ইসলামি হুকুম আহকামে অবদান, মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিষয়গুলিতে আমরা আলোচনা করব।

ইসলামী হুকুম আহকামে আয়েশা সিদ্দিকা রা. এর অবদান

প্রিয় নবীর (সাঃ) ওফাতের সময় হযরত আয়েশার বয়স ছিল ১৮ বছর। ৪৮ বছর তিনি বৈধব্যের জীবন অতিবাহিত করেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি ইসলামী বিশ্বের হেদায়াত, ইলম ও ফজিলত এবং খায়ের ও বরকতের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। তাঁর থেকে ২ হাজার ২শ' ১০টি হাদীস বর্ণিত আছে। অনেকেই বলেছেন, শরীয়তের হুকুম আহকামের এক চতুর্থাংশ হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বিবৃত হয়েছে।

বড় বড় জালিলুল কদর সাহাবী (রাঃ) তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে সব ধরনের মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করতেন। হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রাঃ) বলেন, আমরা এমন কোন বিষয়ের সম্মুখীন হইনি যার জ্ঞান হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট ছিল না। অর্থাৎ প্রত্যেক মাসয়ালা সম্পর্কেই তিনি রাসুলের (সাঃ) আদর্শ পরিজ্ঞাত ছিলেন। হযরত উরওয়াহ বিন যোবায়ের (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, আমি কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, ইতিহাস এবং বংশনামা সম্পর্কে জ্ঞানের ক্ষেত্রে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশার (রাঃ) থেকে বড় আর কাউকে দেখিনি। আহনাফ বিন কায়েস (রাঃ) এবং মুসা বিন তালহা (রাঃ) বলেছেন, হযরত আয়েশার (রাঃ) থেকে সুন্দর ভাষার লোক আমারা দেখিনি ।

হযরত মাবিয়া (রাঃ) বলেছেন, হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বেশী বাগ্মী, বেশী শুদ্ধ ভাষা প্রয়োগকারী এবং বেশী তীক্ষ্ণ মেধার বক্তা আর আমি দেখিনি।

চরিতগ্রন্থসমূহে প্রাপ্ত বিভিন্ন রাওয়ায়েতে প্রমাণিত হয় যে, হযরত আয়েশা সিদ্দিকার (রাঃ) দ্বীনী জ্ঞান ছাড়াও চিকিৎসা, ইতিহাস এবং সাহিত্যেও বিশেষ দখল ছিল।

প্রকৃতপক্ষে হযরত আয়েশার (রাঃ) জ্ঞান ও ফজিলত ছিল বিরাট! এই জ্ঞান ও ফজিলত বর্ণনার জন্য হাজার হাজার পৃষ্ঠার প্রয়োজন। সংক্ষেপে বলতে গেলে তিনি ছিলেন উম্মাহর কল্যাণকামী।

কতিপয় বিশেষ ফজিলতে হযরত আয়েশা (রাঃ) সকল সাহাবী ও মহিলা সাহাবীর মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারিনী। 

হযরত আয়েশা রা এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা 

কাসিম বিন মুহাম্মাদের (রাঃ) বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আয়েশা (রাঃ) স্বয়ং বলেছেন, আমার মধ্যে ১০টি গুণ এমন রয়েছে যা রাসুলের (সাঃ) অন্য স্ত্রীর মধ্যে নেই।

  1. কুমারী অবস্থায় রাসূলের (সাঃ) সঙ্গে শুধু আমারই বিয়ে হয়।
  2. জিবরিল আমিন (আঃ) আমার সুরতে হুজুরের (সাঃ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বলেন যে, আয়েশাকে (রাঃ) বিয়ে করুন। 
  3. আল্লাহ পাক আমার জন্য বারায়াত বা পবিত্রতার আয়াত নাযিল করেন।
  4. আমার মাতা-পিতা উভয়েই মুহাজির।
  5. আমি হুজুরের (সাঃ) সম্মুখে থাকতাম এবং তিনি নামাযে মশগুল হতেন 
  6. আমি এবং রাসূলে করিম (সাঃ) একই পাত্রে গোসল করতাম। 
  7. ওহী নাযিলের সময় শুধু আমি তাঁর পাশে থাকতাম। 
  8. যেদিন আমার পালা ছিল সেইদিনই রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ইন্তেকাল হয়। 
  9.  যখন প্রিয় নবীর (সঃ) পবিত্র রুহ আল্লাহর দিকে যাত্রা করে তখন হুজুরের (সাঃ) পবিত্র মাথা আমার কোলের ওপর ছিল। 
  10. আমার হুজরাতেই রাহমাতুললিল আলামীনকে (সাঃ) দাফন করা হয়।

হাফিজ ইবনে আব্দুল বার (রাঃ) * ইসতিয়াব” গ্রন্থে হুজুরের (সাঃ) এই ইরশাদ নকল করেছেনঃ

"হযরত আয়েশার (রাঃ) মর্যাদা মহিলাদের মধ্যে এমন যেমন সাধারণ খাদ্যের ওপর শুরবা মিশ্রিত রুটির মর্যাদা।”

হযরত ওমর ফারুকের (রাঃ) খিলাফতকালে রাসূলের (সাঃ) সকল স্ত্রীর (রাঃ) বার্ষিক ভাতা ছিল ১০ হাজার দিরহাম। অবশ্য হযরত আয়েশা (রাঃ) ১২ হাজার দিরহাম পেতেন। হযরত ওমর (রাঃ)এর কারণ বর্ণনা করে বলেছেন, তিনি হুজুরে আকরামের (সঃ) অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।

ইরাক বিজয়ের সময় গনিমতের মালের মধ্যে মুক্তার একটি পাত্রও ফারুকে আজমের (রাঃ) খেদমতে প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি জনগণের অনুমতি নিয়ে তা হযরত আয়েশার (রাঃ) খিদমতে পাঠিয়ে দিলেন।

উন্মুল মুমিনিন (রাঃ) বললেনঃ “হে খোদা। হুজুরের (সাঃ) পর ওমর (রাঃ) আমার ওপর বড় ইহসান করেছেন। ভবিষ্যতে তাঁর উপঢৌকনের জন্য আমাকে জীবিতরেখোনা।”

হযরত আয়েশা রাঃ এর দান ও বদান্যতা

নৈতিক মর্যাদার দিক থেকে হযরত আয়েশার (রাঃ) স্থান অনেক উর্ধে ছিল। তিনি অসীম দানশীল, অতিথিপরায়ন এবং দরিদ্র সেবী ছিলেন। একবার হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়ের (রাঃ) তাঁকে এক লাখ দিরহাম প্রেরণ করলেন। তিনি তৎক্ষনাৎ তা গরীব- মিসকিনদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। সেদিন তিনি রোযা ছিলেন। সন্ধ্যায় খাদেম বললোঃ" উম্মুল মুমিনিন! কত ভালই না হতো, যদি আপনি ইফতারের জন্য ঐ অর্থ থেকে কিছু গোস্ত কিনতেন।” তিনি বললেন," তুমিতো স্মরণ করিয়ে দিতে পারতে।”

হযরত উরওয়াহ বিন যোবায়ের (রাঃ) বলেন, একবার হযরত আয়েশার (রাঃ) নিকট ৭০ হাজার পরিমাণ দিরহাম এলো। তিনি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তা খোদার রাস্তারয় বিলিয়ে দিলেন এবং দোপাট্টার আঁচল ঝেড়ে দিলেন ।

ইমাম মালিকের (রঃ) মুয়াত্তায় আছে, হযরত আয়েশা (রাঃ) একদিন রোযা ছিলেন এবং গৃহে একটি রুটি ছাড়া কিছুই ছিলনা। ইত্যবসরে একজন ভিখারিনী এসে হাঁক দিল। তিনি দাসীকে সেই রুটি ভিখারিনীকে দিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। দাসী বললো, সন্ধ্যায় ইফতার কি দিয়ে করবেন? উম্মুল মুমিনিন বললেন, তাকে রুটিতো দিয়ে দাও। সন্ধ্যা হলো। এসময় কোন এক ব্যক্তি হাদিয়া হিসেবে বকরীর গোশত প্রেরণ করলো। তিনি দাসীকে বললেন, দেখ, আল্লাহ রুটির চেয়ে উত্তম জিনিস প্রেরণকরেছেন।

উম্মুল মুমিনিনের (রাঃ) বদান্যতার কোন সীমা-পরিসীমা ছিল না। হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়ের (রাঃ) ছিলেন তাঁর ভাগিনা এবং মুখে ডাকা পুত্র। প্রায়ই তিনি তাঁর খিদমত করতেন। খালার বদান্যতা দেখে দেখে একবার তিনিও ভড়কে গেলেন এবং মুখ ফসকে বলে ফেললেন যে, এখন থেকে তিনি আর কিছু দেবেন না । হযরত আয়েশা (রাঃ) এ কথা জানতে পেরে খুব অসন্তুষ্ট হলেন এবং ইবনে যোবায়েরের (রাঃ) সঙ্গে আর কখনো কথা বলবেন না বলে কসম খেলেন। 

দীর্ঘদিন যাবত তিনি আর তাঁর সঙ্গে কথা বললেন না। তাতে হযরত আব্দুল্লাহ বিন যোবায়ের (রাঃ) খুব ঘাবড়ে গেলেন এবং অতি কষ্টে হযরত মিছওয়ার (রাঃ) বিন মাখরামাহ ও আব্দুর রহমান (রাঃ) বিন আছওয়াদকে মধ্যস্থতা করে অপরাধ ক্ষমা করিয়েছিলেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) কসম ভাঙ্গার কাফফারা হিসেবে ৪০টি গোলাম আযাদ করে দেন। এই ঘটনা যখন তাঁর স্মরণ হতো তখন কেঁদে কেঁদে আঁচল ভিজিয়ে ফেলতেন। ইবনে সায়াদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন, হযরত আয়েশা (রাঃ ) নিজের বাসগৃহ আমীর মাবিয়ার (রাঃ) নিকট বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বিক্রি বাবদ যে অর্থ পেয়েছিলেন তা খোদার রাস্তায় দিয়ে দেন।

হযরত আয়েশা রা এর উত্তম চরিত্র ও খোদাভীতি 

উম্মুল মুমিনিন (রাঃ) রাত -দিনের বেশীর ভাগ সময়ই ইবাদাত অথবা মাসয়ালা-মাসায়েল বলে কাটাতেন। প্রেম-প্রীতি ও স্নেহ-ভালোবাসায় তাঁর হৃদয় ছিল পূর্ণ। শত্রু এবং বিরোধীদেরকেও তিনি ক্ষমা করে দিতেন। প্রখ্যাত সাহাবী কৰিব হাসসান (রাঃ) বিন ছাবিত ইফকের ঘটনায় ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে হযরত আয়েশার (রাঃ) বিরোধিতা করেছিলেন। এই ঘটনায় হযরত আয়েশার (রাঃ) মনে খুব দুঃখ ছিল। কিন্তু এ সত্ত্বেও তিনি হযরত হাসসান (রাঃ) বিন ছাবিতকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। হযরত আয়েশার (রাঃ) কিছু আত্মীয় (রাঃ) ইফকের ঘটনায় জড়িত থাকার কারণে হযরত হাসসানকে (রাঃ) গালি দিতে চাইতেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) তাঁদেরকে অত্যন্ত কঠোরভাবে এ কাজ করতে নিষেধ করেন এবং বলেন, তাঁকে খারাপ বলো না। তিনি রাসূলের (সাঃ) তরফ থেকে মুশরিক কবিদের জবাব দিতেন।

সহোদর মুহাম্মদ বিন আবি বরক (রাঃ) মাবিয়া বিন খাদিজের হাতে নিহত হয়েছিলেন। এজন্য তিনি তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু যখন তিনি শুনলেন যে, জিহাদের ময়দানে অধীনস্তদের সঙ্গে মাবিয়া অত্যন্ত সুন্দর আচরণ করেন, কারোর,

পশু মরে গেলে তাঁকে নিজের পশু দিয়ে দেন, কারোর গোলাম পালিয়ে গেলে তাকে নিজের গোলাম দান করেন এবং সকলেই তাঁর ওপর সন্তুষ্ট, তখন তিনি বললেন, “আসতাগফিরুল্লাহ। যে ব্যক্তির মধ্যে এই সকল গুণ আছে তার ওপর তো অসন্তুষ্ট থাকতে পারি না। যদিও সে আমার ভাইয়ের হত্যাকারী। রাসুলুল্লাহকে (সাঃ ) আমি এই দোয়া করতে শুনেছি, “হে খোদা! যে ব্যক্তি আমার উম্মাতের প্রতি দয়া প্ৰদৰ্শন করবে তার প্রতি তুমিও দয়া প্রদর্শন করো। যে তার প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করবে তার প্রতি তুমিও কঠোরতা প্রদর্শন করো।”

উম্মুল মুমিনিন (রাঃ) গিবত বা পরনিন্দা এবং খারাব কথা মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর থেকে বর্ণিত কোন হাদীসে কোন ব্যক্তিকে হেয়প্রতিপন্ন করার অথবা অপকথার একটি শব্দও পাওয়া যায় না। তিনি এত উদার হৃদয়ের অধিকারিনী ছিলেন যে, সতীনদের গুণাবলী ও প্রশংসা হৃষ্টচিত্তে বর্ণনা করতেন।

তাঁর অন্তরে সীমাহীন খোদাভীতি ছিল। কোন সময় শিক্ষণীয় কোন কথা স্মরণ হলে শুধু কাঁদতেন। একবার তিনি বলেন, ক্রন্দন ছাড়া কখনো আমি পেট পুরে খাই না। তাঁর এক শিষ্য এই কথায় জিজ্ঞেস করলেন, তা কেন? তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যে অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করেন তা আমার মনে পড়ে। খোদার কসম! রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কোন দিন দু'বেলা পেট পুরে রুটি ও গোশত খাননি।

হযরত আয়েশা (রাঃ) আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি ছিলেন গভীরভাবে অনুরক্ত। ফরজ নামায ছাড়াও বেশী বেশী সুন্নাত ও নফল নামায পড়তেন। জীবনে তাহাজ্জুদ ও চাশতের নামায বাদ দেননি। কঠোরভাবে হজ্ব পালন করতেন। রমযানের রোযা ছাড়া প্রচুর নফল রোযা রাখতেন।

হযরত আয়েশা (রাঃ) এর হাদিস বর্নণার পদ্ধতি ও দৃঢ়তা।

হযরত আয়েশা (রাঃ) কোন হাদিস বর্নণা কালে তার নেপথ্য কারণও বর্ণনা করতেন। যে ব্যাখ্যা তিনি দিতেন তা আর বিশ্লেষণের প্রয়োজন হতোনা। তিনি অন্ধ আনুগত্য পছন্দ করতেন না। সব সময়ই প্রিয় নবীর (সাঃ) কথা ও কাজের প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধানের চেষ্টা করতেন। 

মুহাদ্দিসরা এমন কতিপয় রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন, যাতে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) অন্যান্য সাহাবী (রাঃ) থেকে ভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। এ ধরনের কতিপয় রাওয়ায়েত এখানে উল্লেখ করা হলো :

হযরত আয়েশার (রাঃ) সামনে একজন বর্ণনা করলো, আবু হুরায়রা (রাঃ ) বলে থাকেন যে, তিনটি বস্তু অশুভ বা অপয়া। তাহলো মহিলা, ঘর এবং ঘোড়া। হযরত আয়েশা (রাঃ) বললেন, আবু হুরায়রা (রাঃ) অর্ধেক কথা শুনেছে। যখন আবু হুরায়রা (রাঃ) এলো তখন নবী করিম (সাঃ) বাক্যের প্রথম অংশ বলেছিলেন। তাহলোঃ “ইহুদীরা বলে থাকে, মহিলা, ঘর এবং ঘোড়া এই তিন বস্তু অমঙ্গল বা অশুভ।” 

হযরত ওমর (রাঃ) থেকে মৃত ব্যক্তির শোনা সম্পর্কিত একটি রাওয়ায়েত আছে। হযরত ওমর (রাঃ) রাসুলকে জিজ্ঞাসা করার পর তিনি বলেনঃ সে তোমাদের থেকে বেশী শুনে থাকে, কিন্তু জবাব দিতে পারেনা। হযরত আয়েশা যখন এই রাওয়ায়েত শুনলেন তখন বললেন, ওমর (রাঃ) শুনতে ভুল করেছে। এটা রাসুলের (সাঃ) ইরশাদ ছিলনা। কেননা, পবিত্র কুরআনে এর বিরুদ্ধে স্পষ্ট দলিল রয়েছেঃ

فاتك لا تسمع الموتى (سوره ملام) قصا انت بمسمع من في القيوم (سوره فاطر )

অর্থাৎ আপনি মুর্দাদেরকে শোনাতে পারেন না--- এবং যারা কবরে রয়েছে তাদের আপনি শুনানেওয়ালানন।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, “ঘরের লোকদের কান্নায় মৃত ব্যক্তির ওপর আযাব হয়।” হযরত আয়েশা (রাঃ) যখন এই রেওয়ায়েত শুনলেন তখন তা মানতে অস্বীকার করলেন এবং বললেন, প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, রাসুলে করিম (সাঃ) এক ইহুদী মহিলার জানাজার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার নিকটাত্মীয় ও বন্ধু বান্ধব ক্রন্দন করছিল। হুজুর (সাঃ) বললেন, মানুষেরা কাঁদছে আর তার ওপর আযাব হচ্ছে (অর্থাৎ সে নিজের আমলের সাজা ভুগছে)। এরপর বললেন যে, কালামে মজিদে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছেঃ" কেউ অন্যের গুনাহর বোঝা উঠায়না।”

পরিশেষে

সম্মানিত পাঠক!

পুরো আর্টিকেলে আমরা উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা আশাবাদী আপনি ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জানতে পেরেছেন।

যদি আর্টিকেল টি আপনাদের উপকারে আসে তাহলে এটি আপনাদের বন্ধুদের মাঝে বেশি বেশি শেয়ার করুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url