হযরত ফাতিমা রাঃ এর জীবনী। জান্নাতি নারীদের সর্দার। Alfamito Blog

হযরত ফাতেমা রাযিআল্লাহু তা'আলা আনহা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় কন্যা। আমরা তার জীবন ইতিহাসে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই ত্যাগ-তিতিক্ষা, পরহেজগারী খোদাভীতি ও আত্মত্যাগ এর নজিরবিহীন এক আধ্যায়। যার ব্যাপারে বলা হয়েছে যে তিনি জান্নাতি নারীদের সর্দার তো আজ আমরা হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহার জীবন নিয়ে নিয়ে আলোচনা করবো। 

হযরত ফাতিমা রাঃ এর জীবনী

হযরত ফাতেমা রাঃ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য

প্রশ্ন উত্তর
নাম ফাতিমা
লকব জোহরা, তাহেরাহ, মুতহিরাহ, রাজিয়াহ, মুরজিয়াহ এবং যাকিয়াহ
উপাধি সাইয়েদাতুন নিসায়ি আহলিল জান্নাত
পিতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
মাতা খাদিজা রাঃ
জন্ম নবীর (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে
মৃত্যু রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালের ৬ মাস পরই ১১ হিজরীর রমযান মাস

হযরত ফাতিমা রাঃ এর জীবনী

নাম ফাতিমা। রাসূলে করিমের (সাঃ) এর চতুর্থ এবং সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ছিলেন। সাইয়েদাতুন নিসায়াল আলামীন, সাইয়েদাতুন নিসায়ি আহলিল জান্নাত, জোহরা, তাহেরাহ, মুতহিরাহ, রাজিয়াহ, মুরজিয়াহ এবং যাকিয়াহ তাঁর লকব বা উপাধিছিলো।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর জন্ম

সাইয়েদা ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) জন্মকাল সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের রেওয়ায়েত রয়েছে। এক রাওয়ায়েত অনুযায়ী নবীর (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে তাঁর জন্ম হয়েছিল। এ সময় রাসূলের (সাঃ) বয়স ৩৫ বছর ছিল। অন্য এক রেওয়ায়েত অনুসারে তাঁর জন্ম নবুয়ত প্রাপ্তির এক বছর পূর্বে হয়েছিল। আর এক রেওয়ায়েত আছে যে, তিনি নবুয়ত প্রাপ্তির এক বছরের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর শৈশবকাল

শৈশবকাল থেকেই তিনি অত্যন্ত গম্ভীর এবং নির্জন প্রিয় ছিলেন। তিনি কোন সময় কোন খেলাধূলায় অংশ নেননি এবং ঘরের বাইরে পা রাখেননি। সব সময় মায়ের পাশে পাশে থাকতেন। তাঁর ও রাসূলের (সাঃ) নিকট এমন প্রশ্ন করতেন যাতে তাঁর তীক্ষ্ণ মেধার পরিচয় পাওয়া যেত। আত্মপ্রকাশ ও প্রদর্শনীতে ছিল প্রচন্ড অনীহা। হযরত খাদিজাতুল কুবরার (রাঃ) এর এক আত্মীয়ের ছিল বিয়ে। তিনি ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) জন্য ভালো কাপড় ও গহনা বানালেন। বিয়েতে যোগদানের জন্য যখন বাড়ী থেকে বের হওয়ার সময় এলো তখন হযরত ফাতিমা (রাঃ) এই মূল্যবান কাপড় এবং গহনা পড়তে স্পষ্টভাবে অস্বীকার করলেন এবং সাদা-সিধেভাবেই বিয়ের মাহফিলে অংশ নিলেন। শৈশবকাল থেকেই তাঁর সকল তৎপরতায় খোদা প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটতো।

হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ) সাইয়েদা ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি বিশেষ নজর দিতেন। একবার যখন তিনি শিক্ষা দিচ্ছিলেন তখন শিশুটি জিজ্ঞেস করলেন, “আম্মাজান! আল্লাহর অসংখ্য কুদরত আমরা প্রতিনিয়ত _দেখতে পাই। আল্লাহ কি স্বয়ং দেখা দিতে পারেন না । ?”

হযরত খাদিজাতুল কুবরা ফরমালেন, “বেটি আমার। যদি আমরা দুনিয়ায় ভালো কাজ এবং খোদার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করি তাহলে কিয়ামতের দিন খোদার সন্তুষ্টির হকদার হবো এবং সেখানেই খোদার দর্শন লাভ ঘটবে।”

মা খাদিজাতুল কুবরা রাঃ এর ইন্তেকাল

নবুয়তের দশম বছরে হযরত খাদিজাতুল কুবরা ওফাত পেলে হযরত ফাতিমার (রাঃ) ওপর বিপদের পাহাড় নেমে এলো। তাঁর শিক্ষা ও তত্ত্বাবধানের জন্য হুজুর (সাঃ) হযরত ছাওদাহকে (রাঃ) বিয়ে করলেন। হুজুরের (সাঃ) সমগ্র পবিত্র জীবন হকের তাবলীগের কাজে সম্পূর্ণরূপে ওয়াকফ ছিল। কিন্তু যখনই ফুরসত পেতেন তখনই তিনি ফাতিমাতুজ জোহরার নিকট তাশরীফ আনতেন এবং তাঁকে আদর ও মূল্যবান নসিহত প্রদান করতেন।

একাকীত্বের সময় হযরত হাফছা (রাঃ) বিনতে ওমর ফারুক (রাঃ), হযরত আয়েশা (রাঃ) বিনতে আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ), হযরত আসমা (রাঃ) বিনতে আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) এবং ফাতিমা বিনতে যোবায়ের (রাঃ) প্রমুখ তাঁর নিকট প্রায়ই আসতেন এবং দুঃখ লাঘবের চেষ্টা করতেন। হকের তাবলীগের অপরাধে মুশরিকরা প্রিয় নবীকে (সাঃ) খুব কষ্ট দিত। কখনো পবিত্র মাথায় মাটি ঢেলে দিত। রাস্তায় কাঁটা বিছিয়ে রাখতো। যখন হুজুর (সাঃ) ঘরে আসতেন তখন ফাতিমা (রাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন। কখনো স্বয়ং জালিলুল কদর পিতার মুসিবতে রোরুদ্যমান হয়ে পড়তেন। সে সময় হুজুর (সাঃ) তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন এবং বলতেন, আমার প্রিয় !ঘাবড়িয়ো না। খোদা তোমার পিতাকে একা ছেড়ে দেবেন না।”

একবার হুজুর (সাঃ) কাবা শরীফে নামায আদায় করছিলেন। কাফিররা অকাজে মেতে উঠলো। তারা উটের উঝুরি নিয়ে এলো এবং সিজদারত অবস্থায় হুজুরের পবিত্র গর্দানের ওপর রেখে দিল। এই পান্ডাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল উকবাহ বিন আবি মুঈত। জনৈক ব্যক্তি হযরত ফাতিমাতুজ জোহরার নিকট এসে বললো যে, তোমার পিতার সঙ্গে পান্ডারা এই ব্যবহার করছে। একথা শুনতেই তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন এবং দৌড়ে কাবা গৃহে পৌঁছে পবিত্র ঘাড় থেকে উঝুরি সরালেন। এ সময় কাফিররা চারপাশে দাঁড়িয়ে হাসছিল এবং তালি বাজাচ্ছিল। প্রিয় নবীর জালিলুল কদর কন্যা তাদের প্রতি রক্ত চক্ষু নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, “হতভাগারা ! আহকামুল হাকিমিন তোমাদের এই অপকর্মের অবশ্যই শাস্তি দেবেন।” খোদার কি কুদরত। কয়েক বছর পর এইসব বদবখত বদরের যুদ্ধে অত্যন্ত জিন্নতীর সঙ্গে মারা গিয়েছিল।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর হিজরত

মক্কায় কাফির-মুশরিকদের জুলুম-নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আল্লাহর তরফ থেকে রাসুলের (সাঃ) প্রতি হিজরতের নির্দেশ দেয়া হলো। নবুয়তের ১৩ বছরে এক রাতে হুজুর (সাঃ) হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে নিজের পবিত্র বিছানায় শুইয়ে রেখে হযরত আবুবকর সিদ্দিককে (রাঃ) সঙ্গে নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা দিলেন। মদীনা পৌঁছার কিছুদিন পর হুজুর (সাঃ) পরিবার- পরিজনকে আনার জন্য নিজের গোলাম হযরত আবু রাফে (রাঃ) এবং হযরত যায়েদ (রাঃ) বিন হারিছাকে মক্কা প্রেরণ করলেন। এই দুই ব্যক্তির সঙ্গে হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা, হযরত উম্মে কুলছুম (রাঃ), হযরত সাওদা (রাঃ) বিন যায়েদ (রাঃ) মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় পৌঁছে হযরত সাওদা (রাঃ) এবং অন্য কন্যারা হুজুরের (সাঃ) নিকট নতুন ঘরে অবস্থান শুরু করেন।

হযরত ফাতিমা রাঃ উহুদ যুদ্ধ 

উহুদের যুদ্ধে প্রিয় নবী (সাঃ) মারাত্মক আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর শাহাদাতের খবর রটে গিয়েছিল। মদীনায় এই খবর পৌঁছলে হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে উহুদের ময়দানে পৌঁছলেন। হুজুরকে (সাঃ) জীবিত দেখে ধড়ে প্রাণ এলো। কিন্তু শ্রদ্ধেয় পিতার (সাঃ) অবস্থা দেখে অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। হুজুরের (সাঃ) ক্ষত স্থানসমূহ বার বার ধৌত করতে লাগলেন। তবে, কপালের ক্ষত থেকে রক্ত প্রবাহ বন্ধ হচ্ছিল না। অবশেষে খেজুরের চাটাই জ্বালিয়ে ক্ষতের মধ্যে দেয়ায় রক্ত বেরুনো বন্ধ হলো।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর বিবাহ 

মদীনায় হিজরতের সময় সাইয়েদা ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) বয়োপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) হুজুরের (সাঃ) এর নিকট হযরত ফাতিমার (রাঃ) জন্য পয়গাম প্রেরণ করলেন। কিন্তু প্রিয় নবী (সাঃ) চুপ রইলেন অথবা কতিপয় রেওয়ায়েত মুতাবেক ফরমালেন, তা খোদার হুকুম হবে না।” 

অতঃপর হযরত ওমর (রাঃ) বিন খাত্তাব হযরত ফাতিমার (রাঃ) জন্য পয়গাম পাঠালেন। হুজুর (সাঃ) তাঁকেও একই জবাব দিলেন। কিছুদিন পর হুজুর (সাঃ) হযরত ফাতিমাতুজ জোহরার সম্পর্ক শেরে খোদা হযরত আলী কাররামাল্লাহু'র সঙ্গে স্থাপন করলেন। 

এই সম্পর্ক কিভাবে স্থাপিত হলো সে ব্যাপারে তিন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্রথম বর্ণনা হলো

একদিন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ), ওমর ফারুক (রাঃ) এবং সায়াদ (রাঃ) বিন আবি ওকাস পরামর্শ করলেন। তাঁরা বললেন, ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) জন্য হুজুরের (সাঃ) নিকট কয়েকটি পয়গাম এসেছে। কিন্তু তিনি কোন পয়গামই মঞ্জুর করেননি। এখন আলী (রাঃ) বাকী রয়েছে। সেতো রাসূলের (সাঃ) জন্য জীবন উৎসর্গকারী এবং অত্যন্ত প্রিয় ও চাচাতো ভাই। জানা যায় যে, দারিদ্রতা ও অসচ্ছলতার কারণেই সে ফাতিমার (রাঃ) জন্য পয়গাম প্রেরণ করতে পারেনা। তাকে পয়গাম প্রেরণের জন্য উৎসাহিত করা হোক এবং প্রয়োজন হলে তাকে সাহায্যও করা হোক। পরামর্শের পর এই তিন বুজর্গ ব্যক্তি হযরত আলীকে (রাঃ) খুঁজতে বের হলেন। তিনি জঙ্গলে নিজের উট চরাচ্ছিলেন। তাঁরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে হযরত আলীকে (রাঃ) হযরত ফাতিমার '(রাঃ) জন্য পয়গাম প্রেরণে উদ্বুদ্ধ করলেন। কিন্তু সহায় সম্বলহীন হওয়ার কারণে তাঁর পয়গাম . প্রেরণে চিন্তা হলো। তবে এই বুজর্গ ব্যক্তিবর্গ বাধ্য করায় রাজি হলেন। এর পূর্বে অন্তরের আকাংখাওতো তাঁর এই ছিল। স্বভাবজাত লজ্জার কারণে পয়গাম প্রেরণ

করতে পারেননি। এক্ষণে সাহস করে হুজুরের (সাঃ) নিকট পয়গাম পাঠিয়ে দিলেন। হুজুর (সাঃ) তৎক্ষণাৎ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। অতঃপর হুজুর (সাঃ) হযরত ফাতিমার (রাঃ) কাছে এ কথা বললেন। তিনিও চুপ থেকে নিজের সম্মতির কথা প্রকাশকরলেন।

দ্বিতীয় বর্ণনায় আছে যে, 

আনসারদের (রাঃ) একটি দল হযরত আলীকে (রাঃ) হযরত ফাতিমার (রাঃ) জন্য পয়গাম প্রেরণে অনুপ্রাণিত করলেন। হযরত আলী (রাঃ) হুজুরের খিদমতে হাজির হয়ে এ কথা বললেন। হুজুর (সাঃ) তৎক্ষণাৎ বললেন, “আহলান ওয়া মারহাবা।” অতঃপর চুপ মেরে গেলেন। আনসার দলটি বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) তাঁদেরকে হুজুরের (সাঃ) জবাব শুনালেন। তাঁরা হযরত আলীকে (রাঃ) মুবারকবাদ দিলেন। তাঁরা বললেন যে, হুজুর (সাঃ) আপনার পয়গাম মঞ্জুর করেছেন।

তৃতীয় বর্ণনা হলো, 

হযরত আলীর (রাঃ) আযাদকৃত একজন দাসী একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “কেউ কি ফাতিমার (রাঃ) জন্য পয়গাম, প্রেরণ করেছে?” হযরত আলী (রাঃ) জবাব দিলেন, “আমি জানি না।” সে বললো, আপনি কেন পয়গাম প্রেরণ করেন না?” আলী মুরতাজা (রাঃ) বললেন, "আমার নিকট কি আছে , আমি বিয়ে করবো?”

যে, এই নেকবখত মহিলা হযরত আলীকে (রাঃ) জোর করে হুজুরের (সাঃ) খিদমতে পাঠালেন। কিছুটা রাসুলের (সাঃ) শান এবং কিছুটা নিজের স্বভাবজাত লজ্জার কারণে তিনি মুখ খুলে কিছু বলতে পারলেন না। মাথা নীচু করে চুপচাপ বসেরইলেন।

হুজুর (সাঃ) স্বয়ং দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞাসা করলেন, “আলী! কি ব্যাপার আজ যে নিয়ম ভঙ্গ করে সম্পূর্ণ চুপচাপ রইলে, ফাতিমার (রাঃ) সঙ্গে বিয়ের আবেদন নিয়ে এসেছ নাকি?”

হযরত আলী আরজ করলেন, “অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল।”

হযরত ফাতিমা রাঃ এর বিয়ের মোহর

হুজুর (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কাছে মোহর আদায় করার মত কিছু আছে কি?” হযরত আলী না সূচক জবাব দিলেন।

পুনরায় হুজুর (সাঃ) বললেন, “আমি তোমাকে যে যেরাহ বা লৌহবর্ম দিয়েছিলাম, তাই মোহর হিসেবে দিয়ে দাও।”

হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু নবীর (সাঃ) নির্দেশের সামনে মাথা নতকরেদিলেন।

এরপর হযরত আলী (রাঃ) বর্মটি বিক্রির জন্য বাজারের দিকে রওয়ানা হলেন। রাস্তায় হযরত ওসমান জুন্নুরাইনের (রাঃ) সাথে দেখা হলো। তিনি চার শ' ৮০ দিরহাম দিয়ে বর্মটি কিনে নিলেন। অতঃপর তা আবার হযরত আলীকে (রাঃ) উপঢৌকন হিসেবে ফেরত দিলেন।

যেরাহ বিক্রির অর্থ হযরত আলী মুরতাজা (রাঃ) হুজুরের (সঃ) খিদমতে হাজির করলেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “এর তিনভাগের দু'ভাগ খোশবু ইত্যাদি ক্রয়ে খরচ কর এবং অবশিষ্ট একভাগ বিয়ের সাজ-সরঞ্জাম ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য ক্রয়েব্যয়কর।”

কিভাবে বৈবাহিক চুক্তি সম্পূর্ণ হল

অতঃপর হুজুর (সঃ) হযরত আনাসকে (রাঃ) আবুবকর (রাঃ), ওমর (রাঃ), আবদুর রহমান (রাঃ) বিন আওফ ও অন্যান্য মুহাজির ও আনসারকে (রাঃ) ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন। যখন সবাই রাসুলের (সাঃ) দরবারে একত্রিত হলেন, তখন হুজুর (সাঃ) মিম্বরের ওপর তাশরীফ নিলেন এবং বললেনঃ

“হে মুহাজির ও আনসারের দল। এক্ষণই জিবরিল আমীন (আঃ) আমার নিকট এই খবর নিয়ে এসেছিলেন যে, আল্লাহ পাক বাইতুল মা'মুরে ফাতিমা (রাঃ) বিনতে মুহাম্মদের (সাঃ) বিয়ে নিজের খাছ বান্দাহ আলী (রাঃ) বিন আবি তালিবের সঙ্গে দিয়েছেন এবং আমার প্রতি নির্দেশ হয়েছে যে, নতুন করে বিয়ের আকদ করে সাক্ষীদের সামনে ইজাব কবুল করাও।”

এরপর হুজুর (সাঃ) বিয়ের খুতবা পাঠ করলেন এবং মুচকি হেসে আলী মুরতাজাকে বললেনঃ “আমি চারশ' মিসকাল রৌপ্য মোহরের বিনিময়ে ফাতিমাকে (রাঃ) তোমার সঙ্গে নিকাহ দিলাম। তুমি কি তা কবুল করছো ?”

হযরত আলী (রাঃ) আরজ করলেন, “জ্বী, কবুল করলাম।” অতঃপর হুজুর (সঃ) দোয়া করলেন। সকলেই এই দোয়ায় শরীক হলেন।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর বিয়ের সময়কাল 

বিয়ের কাল সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। কেউ বলেন, এই পবিত্র বিয়ে দ্বিতীয় হিজরীর সফর মাসে সুসম্পন্ন হয়েছিল। আবার কেউ বলেন, দ্বিতীয় হিজরীর রজব মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অন্য এক রাওয়ায়েতে তৃতীয় হিজরীর শওয়াল মাসে বিয়ে অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। কতিপয় ঐতিহাসিক বলেছেন, ওহোদের যুদ্ধের পর এবং হযরত আয়েশার (রাঃ) রুখসতের সাড়ে ৪ মাস পর এইবিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। যা হোক, অধিকাংশ চরিতকারের মতে বিয়ের সময় হযরত ফাতিমাতুজ জোহরার বয়স প্রায় ১৫ বছর ছিলো। হযরত আলীর (রাঃ) বয়স ছিল ২১ বছর।

হযরত ফাতিমাকে রাঃ বিদায় 

হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু প্রিয় নবীর (সাঃ) বাসভবন থেকে কিছুদূরে ভাড়ায় একটি বাড়ী নিয়েছিলেন। সাইয়েদাতুন নিসা (রাঃ) রুখসত হয়ে এই বাড়ীর রাণী হলেন। রুখসত বা বিদায়ের পূর্বে হুজুর (সাঃ) হযরত ফাতিমাতুজ জোহরাকে (রাঃ) ডাকলেন। নিজের মুবারক সিনার ওপর তাঁর মাথা রাখলেন এবং কপালে চুমু দিলেন। অতঃপর লখতে জিগর বা কলিজার টুকরা হযরত ফাতিমার (রাঃ) হাত হযরত আলীর (রাঃ) হাতে দিয়ে বললেনঃ "হে আলী। পয়গম্বরের (সাঃ).. এর কন্যা তোমার জন্য মুবারাক হোক।”

এরপর হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) সম্বোধন করে বললেনঃ তোমার স্বামী খুব ভালো।” 'হে ফাতিমা!

অতঃপর তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ফরজ এবং অধিকার সম্পর্কে নসিহত করলেন এবং বিদায় জানানোর জন্য স্বয়ং দরজা পর্যন্ত এলেন। দরজায় আলী মুরতজার (রাঃ) দুই বাহু ধরে দোয়া দিলেন। হযরত আলী (রাঃ) ও সাইয়েদাতুন নিসা উভয়েই উটে সওয়ার হলেন। হযরত সালমান (রাঃ) ফারসী উটের রশি ধরলেন। হযরত আসমা (রাঃ) বিনতে আমিম এবং অন্য কতিপয় রাওয়ায়েতে সালমা (রাঃ) উম্মে রাফে অথবা উম্মে আইমন (রাঃ) তাঁদের সঙ্গে গিয়েছিলেন।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর বিবাহের উপঢৌকন

সারওয়ারে কায়েনাত (রাঃ) বিয়েতে নিজের কলিজার টুকরাকে যেসব সামান উপঢৌকন দিয়েছিলেন তাহলোঃ

  1. উল ভরা মিসরী কাপড়ে প্রস্তুত বিছানা 
  2. নকশা করা একটি পালং
  3. খেজুরের ছাল ভর্তি চামড়ার একটি বালিশ
  4. একটি মশক
  5. পানির জন্ম দু'টি পাত্র বা ঘড়া 
  6. পাল্কি। 
  7. একটি চাফিক বা যাঁতা পেয়ালা
  8. দু'টোচাদর
  9. দু'টি বাজুবন্দ
  10. একটি জায়নামায
  11. পবিত্র বিবাহের ওয়ালিমা

বিয়ের পর হুজুর (সাঃ) হযরত আলীকে (রাঃ) ওয়ালিমার দাওয়াতের ব্যবস্থা করতে বললেন। মোহর আদায়ের পর যে অর্থ বেঁচে গিয়েছিল হযরত আলী (রাঃ) সেই অর্থ দিয়ে ওয়ালিমার ব্যবস্থা করলেন। এতে পনির, খেজুর, জবের নান এবং গোশত্ ছিল। হযরত আসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তৎকালীন যুগে এটা ছিল সর্বোত্তম ওয়ালিমা।

মুহাম্মাদ সা এর ইন্তেকাল 

ইন্তেকালের পূর্বে রাসূলে করিম (সাঃ) যখন বার বার সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন তখন হযরত ফাতিমার (রাঃ) অন্তর টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, হায়! “আমার পিতার অশান্তি।”

হুজুর (সাঃ) বলেছিলেন, “আজকের পর তোমার পিতা আর অশান্তিতে ভুগবেননা।”

প্রিয় নবীর (সাঃ) ইন্তেকালের পর হযরত ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) ওপর শোক ও দুঃখের পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছিল। তিনি বলে উঠলেনঃ “প্রিয় পিতা (সাঃ) হকের দাওয়াত কবুল করেছিলেন এবং জান্নাতুল ফেরদাউসে দাখিল হয়েছেন। আহ! জিবরীলকে (আঃ) তাঁর ইন্তেকালের খবর কে পৌঁছাতে পারে।!”

এরপর দোয়া করলেনঃ “ইলাহী আমার! ফাতিমার (রাঃ) অন্তরকে মুহাম্মাদের (সাঃ) অন্তরের নিকট পৌঁছে দিন। হে খোদা আমার! আমাকে রাসূলে করিমের (সাঃ) দীদার লাভ করিয়ে খুশী করে দিন। ইলাহী। হাশরের দিন মুহাম্মাদের (সাঃ) শাফায়াত থেকে মাহরুম করো না।”

কতিপয় রাওয়ায়েতে রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালে তিনি একটি মরসিয়া আবৃত্তি করেছিলেন বলে বলা হয়েছে। এই মরসিয়ায় তিনি বলেনঃ

“আকাশ ধূলি-ধূসর হয়ে গেল। সূর্য ঢেকে গেল। দুনিয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। নবীর (সাঃ) পর যমিন শুধু দুশ্চিন্তাগ্রস্তই নয় বরং বেদনায় ফেটে গেছে। তার ওপর মুদির গোত্রের লোক এবং সমগ্র ইয়েমেনবাসী ক্রন্দন করে থাকে। বড় বড় পাহাড় এবং শহর কাঁদছে। হে খাতামুর রাসূল। খোদা আপনার ওপর রহমত নাযিল করুন।”

নবী আকরামের (সাঃ) দাফনের পর সাহাবা (রাঃ) ও মহিলা সাহাবীরা (রাঃ) শোক প্রকাশের জন্য তাঁর নিকট এসেছিলেন। কিন্তু তিনি কোন মতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলেন না। সকল চরিতকারই এ ব্যাপারে একমত যে, হুজুরের (সাঃ) ইন্তেকালের পর কেউই সাইয়েদা ফাতিমাতুজ জোহরাকে (রাঃ) হাসতে দেখেননি।

রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর তাঁর মিরাসের মাসয়ালা উত্থাপিত হলো। ফিদক নামক একটি মৌজা ছিল। হুজুর (সাঃ) কতিপয় লোককে এই শর্তে তা দিয়ে রেখেছিলেন যে, তাতে যা উৎপন্ন হবে তার অর্ধেক তারা রাখবে এবং বাকী অর্ধেক হুজুরের (সাঃ) নিকট পাঠিয়ে দেবে। হুজুর (সাঃ) নিজের অংশ থেকে কিছু নিজের পরিবার-পরিজনের খরচের জন্য রাখতেন এবং অবশিষ্ট মুসাফির ও মিসকিনদের জন্য ব্যয় করতেন। কতিপয় ব্যক্তি হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) বললো, ফিদক নবীর (সাঃ) ব্যক্তিগত মালিকানার সম্পত্তি ছিল এবং আপনি তার ওয়ারিস। বস্তুত তিনি প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর সিদ্দিকের (রাঃ) নিকট ফিদকের ওয়ারাসাতের দাবী জানালেন।

হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) জবাব দিলেনঃ “হে ফাতিমা। আমি রাসূলের (সাঃ) নিকটাত্মীয়দেরকে আমার নিকটাত্মীয় থেকে বেশী ভালোবাসি। কিন্তু মুশকিল হলো নবীরা (আঃ) মৃত্যুর সময় যে সম্পদ রেখে যান তার সম্পূর্ণটাই ছাদকা হয়ে যায় এবং তাতে ওয়ারাসাত জারি হয় না। এজন্য আমি সেই সম্পদ ভাগ করতে পারি না। অবশ্য হুজুরের (সাঃ) জীবদ্দশায় আহলে বাইত তা থেকে যে উপকার নিতেন তা এখনো নিতে পারেন। ”

এই জবাবে হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) খুব দুঃখিত হলেন এবং তিনি হযরত আবুবকর সিদ্দিকের (রাঃ) ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে গেলেন। তিনি আজীবন তাঁর সঙ্গে কথা বলেননি।

অন্য এক রাওয়ায়েতে আছে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রাঃ) শুশ্রুষার জন্য উপস্থিত হলেন। সাইয়েদা (রাঃ) তাঁকে নিজের গৃহের অভ্যন্তরে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং এভাবে মনের দুঃখ দূর করেন।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর প্রতি মুহাম্মাদ সা এর ভালবাসা।

প্রিয় নবী (সাঃ) হযরত ফাতিমাতুজ জোহরাকে (রাঃ ) সীমাহীন ভালোবাসতেন। সহিহ বুখারীতে বর্ণিত আছে যে, একবার হযরত আলী কাররামুল্লাহু ওয়াজহাহু আবি জেহেল কন্যা গোরাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সাইয়েদাতুন নিসা (রাঃ) খুব দুঃখিত হলেন। রাসূলে করিম (সাঃ) তাঁর নিকট তাশরীফ আনলেন তখন সাইয়েদা (রাঃ) আরজ করলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল। আলী (রাঃ) আমার ওপর সতীন আনতে চায়।” এ কথা শুনে হুজুরের (সাঃ) অন্তরে খুব আঘাত লাগলো। 

এদিকে গোরার অভিভাবকও হুজুরের (সাঃ) নিকট এই বিয়ের অনুমতি নিতে এলো। হুজুর মসজিদে তাশরীফ নিলেন এবং মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেনঃ "হিশামের বংশধররা আলীর (রাঃ) সঙ্গে নিজের কন্যা বিয়ে দেয়ার জন্য আমার নিকট অনুমতি চায়। কিন্তু আমি অনুমতি দিব না। অবশ্য আলী (রাঃ) আমার কন্যাকে তালাক দিয়ে অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে পারে। ফাতিমা (রাঃ) আমার শরীরের একটি অংশ। যে তাকে কষ্ট দেয় সে আমাকে কষ্ট দেয়। যে তাকে দুঃখ দেয় সে আমাকে দুঃখ দেয়। আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করতে চাই না। কিন্তু খোদার কসম! আল্লাহর রাসূলের কন্যা এবং খোদার দুশমনের কন্যা উভয়ে এক স্থানে একত্রিত হতে পারে না।”

রাসূলের (সাঃ) এই ভাষণের এমন প্রভাব হলো যে, হযরত আলী (রাঃ) তৎক্ষণাৎ বিয়ের ইচ্ছা ত্যাগ করলেন এবং সাইয়েদা ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) জীবিত থাকালীন অবস্থায় অতঃপর দ্বীতিয়বার বিয়ে করার চিন্তা আর অন্তরে কখনে আনেননি।

হুজুর (সাঃ) নিজের কন্যাকে যেমন ভালোবাসতেন তেমনি নিজের জামাইদেরকেও সীমাহীন স্নেহ করতেন। তাঁদেরকে বলতেনঃ “যাদের প্রতি তুমি নারাজ হয়ে গেছ, তাদের প্রতি আমিও অসন্তুষ্ট হবো। যাদের সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধ, আমারও তাদেরর সঙ্গে যুদ্ধ। যাদের সঙ্গে তোমাদের সন্ধি রয়েছে তাদের সঙ্গে আমারও সন্ধি রয়েছে।”

হযরত আলীকে (রাঃ) বলতেনঃ “হে আলী। তুমি দুনিয়া ও আখিরাতে আমার ভাই।”

ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) এর পুত্র হাসান (রাঃ) ও হোসাইনকে (রাঃ) হুজুর (সাঃ) নিজের কলিজার টুকরা মনে করতেন। অত্যন্ত ভালোবাসার সঙ্গে তাঁদেরকে চুমু দিতেন এবং নিজের কাঁধের ওপর উঠিয়ে নিয়ে বেড়াতেন।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর মৃত্যু

রাসুলে করিমের (সাঃ) বিচ্ছিন্নতামূলক দুঃখ সবচেয়ে বেশী বেজেছিল হযরত ফাতিমার (রাঃ) অন্তরে। তিনি সব সময় দুঃখভারাক্রান্ত থাকতেন। তাঁর অন্তর ভেঙ্গে গিয়েছিল। রাসূলের (সাঃ) ইন্তেকালের ৬ মাস পরই ১১ হিজরীর রমযান মাসে ২৯ বছর বয়সে তিনি জান্নাতুল ফেরদাউসের পথে যাত্রা করেন। 

হযরত ফাতিমা রাঃ এর জানাজা ও দাফন 

ওফাতের পূর্বে হযরত আসমা (রাঃ) বিনতে আমিসকে ডেকে বলেছিলেনঃ “আমার জানাযা নেয়ার সময় এবং দাফনের সময় পর্দার পুরো ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং আপনি ও আমার স্বামী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তির নিকট থেকে গোসলের ব্যাপারে সাহায্য নেয়া যাবে না। দাফনের সময় বেশী ভিড় হতে দেয়া যাবে না।”

হযরত আসমা (রাঃ) বলেন, “হে রাসূলের কন্যা। হাবশায় জানাযার ওপর গাছের ডাল বেঁধে ডুলি আকৃতির বানানো হয় এবং তার ওপর পর্দা দিয়ে দেয়া হয়। ” অতঃপর তিনি খেজুরের কয়েকটি ডাল আনালেন এবং তা জোড়া দিলেন। অতঃপর তার ওপর কাপড় টাঙিয়ে সাইয়েদা (রাঃ) বতুলকে দেখালেন। তিনি তা পছন্দ করলেন। বস্তুত ওফাতের পর তাঁর জানাযা ঐভাবেই উঠানো হলো। জানাযায় খুব কম সংখ্যক লোকেরই অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। সাইয়েদার (রাঃ) ওফাত রাতে হয়েছিল এবং ওছিয়ত অনুযায়ী হযরত আলী (রাঃ) রাতেই দাফন করেছিলেন। হযরত আব্বাস (রাঃ) নামাযে জানাযা পড়ান এবং হযরত আলী, হযরত আব্বাস এবং হযরত ফজল বিন আব্বাস (রাঃ) তাঁর লাশ কবরে নামান। দারে আকিলের এক অংশে তাঁকে দাফন করা হয়।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর সন্তান 

সাইয়েদাতুন নিসা ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) ৬টি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল।

  •  হযরত হাসান (রাঃ), 
  • হযরত হোসাইন (রাঃ), 
  • হযরত মুহসিন (রাঃ), 
  • হযরত উম্মে কুলছুম (রাঃ), 
  • রোকেয়া (রাঃ) 
  • ও যয়নব (বাঃ)। 

মুহসিন (রাঃ) এবং রোকেয়া (রাঃ) শৈশবকালেই মারা যান। হযরত হাসান (রাঃ), হোসাইন (রাঃ) এবং হযরত উম্মে কুলছুম (রাঃ) নামকরা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হুজুরের (সাঃ) বংশধারা ফাতিমাতুজ জোহরাকে (রাঃ) দিয়েই অব্যাহত ছিল।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর গুনাবলী ও মর্যাদা 

হযরত ফাতিমা রাঃ এর জীবনী

চরিতকাররা হযরত ফাতিমার (রাঃ) অসংখ্য ফজিলত এবং গুণের বর্ণনা করেছেন। তারমধ্যে কিছু নিম্নরূপ :

সাইয়েদুল মুরছালিন (সাঃ) হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) জান্নাতের মহিলাদের সরদার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

হুজুর (সাঃ) হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) বলতেন, “হে ফাতিমা! তুমি, তোমার স্বামী, তোমরা সস্তান আমার সঙ্গে জান্নাতে একস্থানে থাকবে।”

একবার হুজুর (সাঃ) বললেনঃ “ফাতিমা আমার গোতের টুকরা। যে তাকে ক্রোধান্বিত এবং অসন্তুষ্ট করবে সে আমাকে ক্রোধান্বিত ও অসন্তুষ্ট করে।”

হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ), তাঁর স্বামী নামদার এবং পুত্রদের শানে আল্লাহ তায়ালা তাতহিরের আয়াত নাযিল করেন।

হাদীসের কিতাবসমূহে হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) থেকে ১৮টি হাদীস বর্ণিত আছে। তাঁর হাদীসকারদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু, হযরত হাসান (রাঃ), হযরত হোসাইন (রাঃ), হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) এবং হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর আচার আচরণ ও খোদাভীতি 

হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) কথা-বার্তা, আচার-আচরণ ও চাল- · চলনে রাসুলে করিমের (সাঃ) সর্বোত্তম উদাহরণ ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মুত্তাকী, ধৈর্যশীলা এবং দ্বীনদার মহিলা ছিলেন। গৃহের সকল কাজ স্বহস্তে করতেন। যাঁতা ঘুরাতে ঘুরাতে হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। ঘর ঝাড়ু দেয়া এবং উনুন ফুঁকতে ফুঁকতে কাপড় ময়লা হয়ে যেত। কিন্তু এ সত্ত্বেও এসব কাজ থেকে রেহাই ছিল না। গৃহের কাজ ছাড়া বেশী বেশী ইবাদাত করতেন। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু ফকিরদের বাদশাহ ছিলেন। হযরত ফাতিমাতুজ জোহরাও দারিদ্র ও বুভুক্ষায় তাঁকে পুরোপুরি সহযোগিতা করতেন। মহান সম্মানিত বা জালিলুলকদর পিতা আরবের তথা দোজাহানের বাদশাহ ছিলেন। কিন্তু জামাই ও কন্যা কয়েক বেলা অব্যাহতভাবে অভুক্ত থাকতেন।

একদিন স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আট প্রহর পর্যন্ত তথা ছিলেন। কোন স্থানে মজুরির বিনিময়ে হযরত আলী (রাঃ) এক দিরহাম পেয়েছিলেন। তখন রাত হয়ে গেছে। কোন স্থান থেকে এক দিরহামের যব কিনে বাড়ী পৌঁছলেন। ফাতিমা (রাঃ) হাসি-খুশীভাবে নামদার স্বামীকে অভ্যর্থনা জানালেন। তাঁর নিকট থেকে যব নিয়ে পিষলেন। রুটি বানালেন এবং আলী মুরতাজার (রাঃ) সামনে তা রাখলেন। তাঁর খাওয়ার পর তিনি খেতে বসলেন। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সে সময় আমার সাইয়েদুল বাশারের (সাঃ) এই ইরশাদ স্মরণে এলো যে, "ফাতিমা দুনিয়ার সর্বোত্তম মহিলা।”

এটা ছিল সেই যুগ যখন প্রতিদিন ইসলামী বিজয় ছড়িয়ে পড়ছিল। মদীনা মুনাওয়ারায় অধিক পরিমাণে গনিমতের মাল আসা শুরু হয়েছিল। একদিন হযরত আলী (রাঃ) জানতে পেলেন যে, গনিমতের মালে কিছু দাসীও এসেছে। তিনি হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) বললেন, “ফাতিমা। যাঁতা পিষতে পিষতে তোমার হাতে ফোস্কা এবং উনুন জ্বালাতে জ্বালাতে তোমার চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেছে। হুজুরের (সাঃ) নিকট আজ গনিমতের মালের মধ্যে অনেক দাসী এসেছে। দোজাহানের বাদশাহর (সাঃ) নিকট গিয়ে একটি দাসী চেয়ে নিয়ে এসো।”

হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ)নবী করিমের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলেন। কিন্তু লজ্জায় মুখ দিয়ে কিছু চাইতে পারলেন না। কিছুক্ষণ হুজুরের (সাঃ) খিদমতে অবস্থান করে ফিরে এলেন এবং হযরত আলীকে (রাঃ) বললেন যে, হুজুরের (সাঃ) নিকট কোন দাসী চাওয়ার সাহস তাঁর হয়নি। অতঃপর স্বামী-স্ত্রী উভয়েই হুজুরের (সাঃ) খিদমতে হাজির হয়ে কাজের কষ্টের কথা উল্লেখ করে একটি দাসী প্রাপ্তির আবেদন জানালেন।

সারওয়ারে কায়েনাত হযরত রাসুলে করিম (সাঃ) বললেনঃ “আমি কোন কয়েদীকে তোমাদের খিদমতের জন্য দিতে পারি না। আসহাবে ছুফফার খাওয়া- পড়ার সন্তোষজনক ব্যবস্থা এখন আমাকে করতে হবে। আমি তাদেরকে কি করে ভুলে যেতে পারি যারা নিজেদের বাড়ী-ঘর ছেড়ে খোদা ও খোদার রাসুলের (সাঃ) সন্তুষ্টির জন্য দারিদ্র ও বুভুক্ষা গ্রহণ করে নিয়েছে।”

হযরত ফাতিমা রাঃ এর যুহ্দ ও আত্মত্যাগ 

একবার রাসুলে করিম (সাঃ) হযরত ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) গৃহে গিয়ে দেখলেন যে, সাইয়েদাতুন নিসা (রাঃ) উটের চামড়ার পোশাক পরে আছেন এবং তাতেও ১৩টি পট্টি মারা। তিনি আটা পিষছেন এবং মুখ দিয়ে আল্লাহর কালাম উচ্চারণ করে চলেছেন। হুজুর (সাঃ) এই দৃশ্য দেখে বিহবল হয়ে বললেনঃ “ফাতিমা ! সবরের মাধ্যমে দুনিয়ার কষ্ট শেষ কর এবং আখিরাতের স্থায়ী খুশীর অপেক্ষা কর। আল্লাহ তোমাদেরকে নেক পুরস্কার দেবেন।”

হযরত আবু যর গিফারী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, একবার হুজুর (সাঃ) আমাকে হযরত আলীকে (রাঃ) ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন। আমি যখন তাঁর গৃহে পৌঁছলাম তখন দেখলাম যে সাইয়েদাতুন নিসা (রাঃ) হযরত হোসাইনকে (রাঃ) কোলে নিয়ে যাঁতা পিষছেন।

বাস্তবত হযরত ফাতিমা (রাঃ) প্রায়ই দু'বেলা অভুক্ত থাকতেন এবং সন্তানদের কোলে নিয়ে যাঁতা পিষতেন।

একবার ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) মসজিদে নববীতে তাশরীফ নিলেন এবং রুটির একটি অংশ প্রিয় নবীকে (সাঃ) দিলেন। হুজুর (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, এই রুটি কোত্থেকে এলো?” হযরত ফাতিমা (রাঃ) বললেন, “আব্বাজান! সামান্য যব পিষে রুটি বানিয়েছিলাম। যখন বাচ্চাদেরকে খাওয়াচ্ছিলাম তখন খেয়াল এলো যে আপনাকেও কিছু খাইয়ে দিই। হে খোদার রাসুল! তৃতীয় বেলা অভুক্ত থাকার পর এই রুটি ভাগ্যে জুটেছে।” হুজুর (সাঃ) রুটি খেলেন এবং বললেনঃ “হে আমার কন্যা। চার বেলা অভূক্ত থাকার পর এই প্রথম রুটির টুকরা তোমার পিতার মুখে পৌঁচছে।”

একবার হুজুর (সাঃ) ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) গৃহে তাশরীফ নিয়ে দেখলেন যে, দরজায় রঙ্গীন পর্দা ঝুলছে এবং ফাতিমার (রাঃ) হাতে দু'টো রূপোর চুরি। এদেখে তিনি ফিরে এলেন। হযরত সাইয়েদাহ খুব মর্মাহত হলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। ইত্যবসরে হুজুরের (সাঃ) গোলাম হযরত আবু রাফে (রাঃ) এসে উপস্থিত হলেন। কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। হযরত সাইয়েদাহ (রাঃ) ঘটনা বললেন। তিনি বললেন, হুজুর (সাঃ) চুরি ও পর্দা পছন্দ করেননি। হযরত ফাতিমা (রাঃ ) তৎক্ষণাৎ উভয় বস্তুকেই হুজুরের (সাঃ) খিদমতে পাঠিয়ে দিলেন এবং বলে দিলেন যে, তিনি এসব খোদার রাস্তায় দিয়ে দিয়েছেন। হুজুর (সাঃ) খুব খুশী হলেন। নিজের কন্যার কল্যাণ ও বরকত কামনা করে দোয়া করলেন এবং তা বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ আসহাবে ছুফফার ব্যয় নির্বাহে খরচ করে দিলেন।

একবার হযরত আলী (রাঃ) ঘরে ফিরে কিছু খাবার চাইলেন। সাইয়েদাহ (রাঃ) বললেন, “অভুক্ত অবস্থায় আজ তৃতীয় দিন চলছে। যবের একটি দানাও ঘরে নেই।” হযরত আলী (রাঃ) বললেন, “হে ফাতিমা, আমাকে তুমি বলনি কেন?” সাইয়েদাতুন নিসা (রাঃ) জবাবে বললেন, “হে আমার মাথার মুকুট। রুখসতির সময় আমার পিতা (সাঃ) নসিহত করে বলেছিলেন যে, আমি যেন সওয়াল করে আপনাকে লজ্জিত না করি।”

হযরত ফাতিমা রাঃ এর দান ও বদান্যতা 

একবার বনু সলিম গোত্রের এক দুর্বল বৃদ্ধ মুসলমান হলেন। হুজুর (সাঃ) তাঁকে দ্বীনের জরুরী আহকাম ও মাসায়েল বর্ণনা করলেন অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কি কোন মাল আছে? তিনি বললেন, “খোদার কসম ! বনি সলিমের তিন হাজার মানুষের মধ্যে আমিই সবচেয়ে গরীব ও ফকীর।” হুজুর (সাঃ) সাহাবাদের (রাঃ) প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কে এই মিসকিনকে সাহায্য করবে ?”

হযরত সায়াদ (রাঃ) বিন উবাদাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল (সাঃ)। আমার একটি উটনী আছে। আমি তাঁকে তা দিচ্ছি।” হুজুর (সাঃ) এরপর বললেন,“ তোমাদের মধ্যে কে আছ যে, তার মাথা ঢেকে দেবে?”

সাইয়েদেনা আলী মুরতাজা (রাঃ) উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের পাগড়ী খুলে তাঁর মাথায় পরিয়ে দিলেন।

অতঃপর হুজুর (সাঃ) বললেনঃ “কে আছে যে তার খাবারের বন্দোবস্ত করবে?”

হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) সেই বৃদ্ধ আরাবীকে সঙ্গে নিলেন এবং তাঁর খাবারের বন্দোবস্ত করার জন্য বেরোলেন। কয়েকটি গৃহে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু কিছুই পেলেন না। অতঃপর হযরত ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) বাড়ীতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, “কে”? তিনি সকল ঘটনা বর্ণনা করলেন এবং আশা প্রকাশ করে বললেন, “হে আল্লাহর সত্য রাসুলের (সাঃ) কন্যা। এই মিসকিনের খাবারের বন্দোবস্ত করুন।”

হযরত ফাতিমা (রাঃ) বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “হে সালমান। খোদার কসম। আজ আমরা তৃতীয় দিনের মত অভুক্ত রয়েছি। শিশু দু'টি ভুখা অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। কিন্তু সায়েলকে খালি হাতে ফিরে যেতে দেবো না। আমার এই চাদর শামউন ইহুদীর নিকট নিয়ে যাও এবং বলো ফাতিমা (রাঃ) বিনতে মুহাম্মদের (সাঃ) এই চাদর রেখে গরীব মানুষটিকে কিছু দাও।”

সালমান (রাঃ) আরাবীকে সঙ্গে নিয়ে ইহুদীর নিকট গেলেন এবং তাঁকে সকল বৃত্তান্ত বললেন। বৃত্তান্ত শুনে তিনি হয়রান হয়ে পড়লেন এবং বলে উঠলেন, “হে সালমান (রাঃ)। খোদার কসম, এঁরা তাঁরা যাঁদের ব্যাপারে তাওরীতে উল্লেখ করা হয়েছে। তুমি সাক্ষী থেকো যে, আমি ফাতিমার (রাঃ) পিতার (সাঃ) ওপর ঈমান এনেছি।” এরপর কিছু খাদ্য হযরত সালমানকে (রাঃ) দিলেন এবং চাদরও সাইয়েদা ফাতিমাকে (রাঃ) ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তা নিয়ে তাঁর নিকট পৌঁছলেন। সাইয়েদা (রাঃ) স্বহস্তে আনাজ পিষলেন এবং তাড়াতাড়ি আরাবীর জন্য রুটি বানিয়ে হযরত সালমানকে (রাঃ) দিলেন। তিনি বললেন, “এ থেকে বাচ্চাদের জন্য কিছু রেখে দিন।” হযরত ফাতিমা (রাঃ) জবাব দিলেন, “যা আমি আল্লাহর রাস্তায় দিয়েছি, তা নিজ বাচ্চাদের জন্য বৈধ নয়।”

হযরত সালমান (রাঃ) রুটি নিয়ে হুজুরের (সাঃ) খিদমতে হাজির হলেন। হুজুর (সাঃ) সেই রুটি আরাবীকে দিলেন এবং ফাতিমাতুজ জোহরার (রাঃ) গৃহে তাশরীফ নিলেন। তাঁর মাথায় নিজের স্নেহের হাত বুলালেন, আকাশের দিকে তাকালেন এবং দোয়া করলেনঃ “হে আমার খোদা! ফাতিমা তোমার দাসী। তার প্রতি সন্তুষ্ট থেকো।”

একবার জনৈক ব্যক্তি হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, চল্লিশ উটের যাকাত কি হবে? সাইয়েদা ফাতিমা (রাঃ) বললেন,” তোমার জন্য শুধু এক উট। আমার নিকট যদি চল্লিশটি উট থাকে তাহলে আমি সবই আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দেব।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, একবার হযরত আলী (রাঃ) সারা রাত ধরে একটি বাগানে সেচ দিলেন এবং মজুরী হিসেবে সামান্য পরিমাণ যব পেলেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ) তা থেকে এক অংশ নিয়ে আটা পিষলেন এবং খাবার তৈরী করলেন। ঠিক খাবার সময় এক মিসকিন দরজায় কড়া নাড়লো এবং বললো, “আমি ভূখা আছি।” হযরত সাইয়েদা (রাঃ) সম্পূর্ণ খাবার তাকে দিয়ে দিলেন। অতঃপর অবশিষ্ট আনাজের কিছু অংশ নিয়ে পিষলেন এবং খাবার তৈরী করলেন। খানা তৈরী শেষ হতেই একজন দরজায় এস হাত পেতে দাঁড়ালো। তিনি সব খাবার তাকে দিয়ে দিলেন। অতঃপর অবশিষ্ট আনাজ পিষলেন এবং খাবার তৈরী করলেন।

 ইতিমধ্যে একজন মুশরিক কয়েদী আল্লাহর রাস্তায় খাবার চাইলো। সেই সকল খাবার তাকে দিয়ে দেয়া হলো। মোট কথা বাড়ীর সকলেই সেদিন অভুক্ত রইলেন। আল্লাহ্ পাক তাঁদের এই দানকে এমন পছন্দ করলেন যে, তাঁদের সবার জন্য এই আয়াত নাযিল হলো।

لمُونَ الطَّعَامَ عَلى يا مسكينا وينيات اسرة

এবং সে আলাহর রাস্তায় মিসকিন, এতিম এবং কয়েদীকে খাবার খাওয়ায়।

হযরত ফাতিমা রাঃ এর স্বামীর প্রতি আনুগত্য

একবার সাইয়েদা (রাঃ) অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ থেকেও সারা রাত ইবাদাতে কাটালেন। সকালে হযরত আলী (রাঃ) যখন নামাযের জন্য মসজিদে গেলেন, তখন তিনি নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। নামায শেষ করে যাঁতা পিষতে লাগলেন। হযরত আলী (রাঃ) ফিরে এসে তাঁকে যাঁতা পিষতে দেখে বললেনঃ “হে খোদার রাসূলের কন্যা। এতো পরিশ্রম কর না। কিছুক্ষণ আরাম কর। নচেত অসুখ বেশী হয়ে যাবে।

হযরত ফাতিমা (রাঃ) বলতে লাগলেনঃ খোদার ইবাদাত এবং আপনার ইতায়াত বা আনুগত্য অসুখের সর্বোত্তম চিকিৎসা। এরমধ্যে যদি কোনটি মৃত্যুর কারণ হয় তাহলে তারচেয়ে বেশী আমার জন্য আর সৌভাগ্যের কি হতে পারে।”

হযরত ফাতিমা রাঃ এর ঘটনা 

প্রিয় নবীর (সাঃ) ইন্তেকালের কিছুদিন পূর্বে হযরত ফাতিমাতুজ জোহরা (রাঃ) খবর নেয়ার জন্য হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহর (রাঃ) হুজরাতে তাশরীফ নিলেন। হুজুর (সাঃ) অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তাঁকে নিজের কাছে বসালেন এবং কানে আস্তে আস্তে কিছু বললেন। এ কথা শুনে তিনি কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর হুজুর (সাঃ) অন্য কোন কথা তাঁর কানে কানে বললেন। এ কথা শুনে তিনি হাসতে লাগলেন। যখন তিনি ফিরে চললেন তখন আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন. “হে ফাতিমা। তোমার কাঁদা এবং হাসার মধ্যে কি রহস্য রয়েছে?” সাইয়েদা (রাঃ) বললেন, ” যে কথা হুজুর (সাঃ) গোপন রেখেছেন, আমি তা প্রকাশ করবো না। *

রাসুলে করিমের (সাঃ) বিদায়ের পর একদিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকাহ (রাঃ) অন্য রেওয়ায়েত অনুযায়ী হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) হযরত ফাতিমাকে (রাঃ) সেই দিনের ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন। হযরত ফাতিমা (রাঃ) বললেনঃ "হুজুর (সাঃ) বলেছিলেন যে, জীবরাইল আমীন (আঃ) একবার কুরআন মজিদ পাঠ করতেন। এই বছর নিয়ম ভঙ্গ করে দু'বার পাঠ করেছেন। এ থেকে ধারণা করা হয় যে, আমার ওফাতের সময় নিকটে এসে গেছে।” এতে আমি কাঁদতে লাগলাম।

অতঃপর হুজুর (সাঃ) বলেছিলেনঃ “আহলে বাইতের মধ্যে সর্বপ্রথম তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হবে এবং তুমি জান্নাতে মহিলাদের সর্দার হবে।” এ কথায় আমি খুব খুশী হলাম এবং হাসতে লাগলাম ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url