মহাকবি আলাওলের জীবনী ।আলাওল রচনাবলী। Alfamito Blog

প্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যসময় পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ বলে ধরা হয়। মধ্যযুগীয় সাহিত্য বলতে মূলত পদাবলি, পুঁথিসাহিত্য ও কিছু মহাকাব্য রচিত হয়েছে। পরিণত বাংলা ভাষার সাহিত্যের শুরু থেকেই মানুষ-অপ্রধান সাহিত্য রচিত হয়ে এসেছে। এমনকি মধ্যযুগে রচিত হতে-থাকা সাহিত্যেও মানুষ ছিল গৌণ। এসময় রচিত-হওয়া দুটি অন্যতম মহাকাব্য মহাভারত ও রামায়ন ছিল দেব-দেবী, দৈত্য-দানবের সংস্কৃত উপাখ্যান থেকে অনূদিত।

মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অন্য একটি সমৃদ্ধ ধারা হচ্ছে বৈষ্ণব পদাবলি। বৈষ্ণবধর্মের অনুসারী কবিরা এসময় প্রচুর পরিমাণে বৈষ্ণব পদ রচনা করেছে। বৈষ্ণব পদাবলি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে বলা যায়। কিন্তু রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে তৈরি এসব পদেও মানুষের কথা ছিল না। 

মহাকবি আলাওলের জীবনী

ঠিক এই সময়ে একশ্রেণীর প্রগতিশীল সাহিত্যিক প্রথম অতিপ্রাকৃতিক সাহিত্যধারণা থেকে বের হয়ে এসে মানবীয় সাহিত্য রচনা সৃষ্টির সূচনা করেছেন। তাঁরা বিভিন্ন মানুষ-প্রধান সাহিত্য বাংলায় অনুবাদের পাশাপাশি মৌলিক সাহিত্যও রচনা করতে থাকেন। তাঁরা সর্বপ্রথম মানুষ-প্রধান মহাকাব্য রচনার উদ্যোগ নেন। অন্যান্য ভাষায় রচিত এবং বিভিন্ন মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের রচনা তাঁরা বাংলায় অনুবাদ করেন। শুরু হয় মানবীয় সাহিত্যধারণার। তার আগে মানুষের কাব্যে মানুষ ছিল না বাংলায়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম উৎকর্ষিক বিপ্লব সাধিত হয়েছে এই সময়ে এসে। 

এটি বাংলা সাহিত্যের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর এই বিপ্লব সাধিত হয়েছে যে সকল সাহিত্যিকের হাতে মহাকবি আলাওল ছিলেন তাঁদের। অন্যতম একজন।

মহাকবি আলাওলের  জীবনী 

আলাওল ছিলেন প্রথমত পণ্ডিত মানুষ। তাঁর পণ্ডিত-মানস ও কাব্যিক সত্তার যুগপত্তা তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য। আলাওল ছিলেন সমসাময়িকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি ছিলেন বহুভাষী সস্কৃত, হিন্দি, আরবি, ফার্সি ও বেশকিছু প্রাদেশিক ভাষায় তাঁর ভালো দক্ষতা ছিল।

আলাওলের শৈশব ও বংশ পরিচয় 

সপ্তদশ শতকের কবি আলাওল তাঁর জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো বর্ণনা কোথাও দেননি। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, তাঁর সমসাময়িক কোনো সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিকও তাঁর ব্যাপারে খুব কিছু আপাদলম্বিত কেশ কস্তুরী সৌরভ লিখে রাখেননি। আলাওলের বিভিন্ন কাব্যে টুকরো টুকরো আত্ম-কথন ও ঘটনা বর্ণনা থেকে যতটুকু তথ্য পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ

তৎকালীন গঙ্গা-বিধৌত সমভূমি ফতেহাবাদ পরগণার (বর্তমানে ফরিদপুর জেলা ও তার আশপাশের অঞ্চল) অধিপতি মজলিস কুতুবের অমাত্য ছিলেন তাঁর পিতা। কাজের উদ্দেশ্যে পিতার সাথে তিনি যখন কোথাও যাচ্ছিলেন পথে পর্তুগিজ জলদস্যুদের দ্বারা তাঁদের নৌকা আক্রান্ত হলে তাঁর পিতা দস্যুদের সাথে লড়াই করতে করতে শহিদ হন। 

আলাওল অনেক দুঃখকষ্ট সয়ে অবশেষে আরাকানের রাজধানী রোসাংয়ে এসে উপস্থিত হন। এখানে এসে তিনি রাজ-অশ্বারোহী হিসেবে সৈন্যদলে যোগ দেন। 

কর্মজীবন 

সৈন্যদলে যোগ দেয়ার পরে তাঁর কাব্য-প্রতিভা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লে আরাকান রাজসভার মুসলমান মন্ত্রী মাগন ঠাকুরের আশ্রয়ে কাব্যচর্চা করতে থাকেন এবং সভাকবি রূপে আরাকান রাজসভায় তাঁকে আসন দেওয়া হয়। 

কোনো কোনো গবেষক বলেন যে, আলাওল মূলত সরাসরি রাজসভার কবি ছিলেন না। বরং মাগন ঠাকুর-সহ অন্য মুসলমান কবিদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি জীবনের একটা লম্বা সময় কাব্যচর্চায় ব্যাপৃত থাকেন। উল্লেখ্য যে, সেসময় অনেক বড় বড় মুসলিম পণ্ডিত ও কবি-সাহিত্যিকের সমাবেশ ঘটেছিল আরাকান রাজসভায়। 

মধ্যযুগে সাহিত্যচর্চার একটা সমৃদ্ধ মহল ছিল আরাকান রাজসভা। সেখানেই কবি পদ্মাবতী-সহ তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।

আলাওলের রচনাগুলি

আলাওলের প্রধান রচনাগুলি মূলত অনুবাদ-কাব্য। কিন্তু তাঁর ভাষাগত দক্ষতা, জ্ঞানের প্রাচুর্য, শব্দের ব্যাপকতা ও কুশল ব্যবহার, ভাবগত স্বকীয়তা তাঁর অনুবাদ সমূহকে মৌলিক রচনার সমকক্ষ করে তুলেছে। আলাওলের রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা সাতটি। এদের মধ্যে পদ্মাবতী কাব্যগ্রন্থটি অন্যতম ও আলাওলের প্রথম রচনা।

 পদ্মাবতী পাঠ করতে গেলে মনে হবে যেন একটি সুন্দর সুনির্মিত প্রাসাদ: একজন সেরা শিল্পী পৃথিবীর নানা-প্রান্ত থেকে সুন্দরতম রত্নসমূহ বাছাই করে এনে সাজিয়ে দিয়েছেন তাঁর সমস্ত দেয়াল, কক্ষ- উপকক্ষ। আলাওল ছিলেন আধুনিক-পূর্ব কাব্যচিন্তার কবি। তিনি পদ্মাবতী কাব্যে রাণী পদ্মাবতীর চুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন—

"মহাঅন্ধকারময় দৃষ্টি পরাভব"

অর্থাৎ, পা পর্যন্ত লম্বা (তার) চুল, তাতে হরিণের নাভির মতো সৌরভ; এতো কালো যে চোখের দৃষ্টিও সেখানে পরাজিত হয়। কবির এই লাইন পাঠ করে আমাদের মনে ভেসে ওঠে যেন কয়েক শতাব্দী পর কোনো আরেক বিদগ্ধ কবি বলছেন তাঁর বনলতা সেনের ব্যাপারে

চুল তার কবেকার অন্ধকার, বিদিশার নিশা মহাকবি আলাওল কাব্যে যেভাবে উপমা ও কাব্য-চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তাতে আমরা তাঁর কাব্যে আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশকে আবিষ্কার করে ফেলি। তিনি তাঁর রচনায় নিজস্ব রুচি ও প্রকৃতিকে এভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর কাব্যের অবাঙালি উপাদানেও একরকম বাঙালিকরণ লক্ষ করা যায়।

 আর তাই পদ্মাবতী কাব্য পাঠকালে এক ভিনদেশি চরিত্র রাণী পদ্মাবতী ও তাঁর বর্ণনায় একজন বাঙালি নারী রূপে ফুটে উঠেছেন বলে মনে হয়। এসব কারণে তাঁর অনূদিত কাব্যগুলোকে মূলত তাঁর মৌলিক রচনা বলেই ধরে নেওয়া হয়।

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একটা বড় নির্মাণ হচ্ছে পদাবলি। গণ্ডিবদ্ধ এই ব্যাপারটা সমসাময়িক সাহিত্যচিন্তায় এতোটা প্রভাব বিস্তার করে যে আমাদের বিশেষ স্বস্তির জায়গা অসাম্প্রদায়িক কৰি নজরুলের মতোই অনেক মুসলিম কবিও তাতে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন এবং অসংখ্য পদাবলি রচনা করেন।

 বরং বিচার করলে দেখা যায়, অনেক মুসলিম কবির পদাবলি কাব্যগুণে বৈষ্ণবদের থেকেও উত্তম ছিল। আধুনিক সাহিত্যে যেমন কৰি নজরুলের শ্যামাসংগীতের কথা উল্লেখ করা যায়। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরবর্তীতে এসে কোনো কোনো সাহিত্য-সমালোচক সেইসব বৈষ্ণব পদাবলি-রচনাকার মুসলিম কবিদের ‘মুসলিম বৈষ্ণব কবি' বলে উল্লেখ করেছেন। 

আলাওল ছিলেন এই কু-প্রভাবের বাইরের বিস্তৃত সাহিত্যচিন্তার একজন কবি। আর সেকারণেই তাঁর হাতে সর্বপ্রথম মানবীয় মহাকাব্য রচিত হয়েছে। আলাওলের বেশ কিছু পদাবলি পাওয়া যায় যা নির্মাণ ও ভাবগত দিক থেকে বৈষ্ণব পদাবলির অনুরূপ হওয়ায় অনেকেই তাঁকে বৈষ্ণব কবিদের অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন। 

প্রধানকীর্তি

মধ্যযুগীয় সাহিত্যে এইসব কল্পিত দৈত্য-দেবতা ও নানা রূপ-গুণ-বৈশিষ্ট বিশিষ্ট দেবীদের প্রতি চরম উদাসীনতা এবং বিপরীতে মানবীয় মহাকাব্য রচনার উদ্যোগই মূলত আলাওলের প্রধান কীর্তি যা বাংলা সাহিত্যে বাস্তবধর্মী কাব্যধারার সূচনা করেছে। 

তবে আমরা কবির বেশকিছু বিচ্ছিন্ন কবিতা ও পুথি-পদাবলি খুঁজে পাই যাতে প্রেম, বিরহ, মিলন ও আধ্যাত্মিকতার মতো ব্যাপারগুলো আরো সুনিপুণ, সুন্দর ও সুরেলাভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর এইসব রচনা এতটাই নিবিড়, কোমল ও করুণ, সুগভীর যে, পাঠকের মন মর্মরসে আপ্লুত হয়ে ওঠে।

আলাওলের প্রধান কাব্যগুলো মূলত উপাখ্যান- নির্ভর। তাতে নিবিড়ভাবে কোথাও সাধারণ জন-মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কথা নেই। এর কারণ হিসেবে বলা যায় যে তিনি একজন রাজসভার কবি ছিলেন। আর রাজসভায় মার্জিত রুচি ও বিলাসবহুল জীবনাদর্শের যে কাব্যচর্চা হয়েছে প্রজাশ্রেণীর জীবনের সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না।

 এই সম্পর্কহীনতা আলাওলকে গণজীবন-ধর্মী চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। বাস্তব জীবনে আলাওল ছিলেন একজন লোনলি মানুষ। কৈশোর পার না হতেই তিনি নিজদেশ, সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। এই একাকিত্ব তিনি সারাজীবনেও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। 

তাঁর রচনাগুলো হতে খণ্ড খণ্ড যতটুকু তাঁর আত্মজৈবনিক উল্লেখ পাওয়া যায় সবখানেই তিনি নিজের অসম্পূর্ণ পরিচয়, দুঃখ-কষ্ট ও ব্যক্তি জীবনের দুর্দশার কথা বলেছেন। এর বাইরে কোথাও পরিবার, সমাজ বা সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেননি। আর জীবনের অর্ধেকটা তো কাটিয়েছিলেন রাজসভাতেই। 

স্বাভাবিক জন-জীবনযাত্রা তাই তাঁকে ছুঁতে পারেনি। ফলে তাঁর কাব্য-রচনার মধ্যে কোথাও সমাজের সাধারণ জন-শ্রেণী জীবনধারার বৈচিত্রের ছাপও খুব একটা পড়েনি। কিন্তু কবির জন্যে রচনার সাথে জীবন ও জনতার এই বিচ্ছিন্নতা অস্বাভাবিক ছিল না হয়। তো যার জীবনই ছিল বিরহ ও বিচ্ছিন্নতার।

মহাকবি আলাওলের শেষ জীবন

মহাকবি আলাওল শেষ জীবনে খুবই মানবেতর জীবন যাপন করেন। এর আগে তাঁর জীবনে বিভিন্ন দুর্যোগ আসে। মধ্যবয়সে একবার বদলোকের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পঞ্চাশ দিন কারাবাসে থাকতে হয় তাঁকে। এরপর সুদীর্ঘ কাল প্রায় আট বছরের মতো সময় তাঁর কাব্য চর্চা বন্ধ ছিল। 

হয়তো জীবনের বিপর্যস্ততায় কাহিল হয়ে পড়েছিলেন। আনুমানিক ষোলো-সতেরো বছর বয়সে তিনি ঘর ছাড়েন — জীবনে আর ফেরা হয়নি। আরাকানেও তাঁর সংসার-জীবনের বিস্তারিত কোনো উল্লেখ নেই। তবে তিনি সংসারী হয়েছিলেন তার একটা প্রমাণ পাওয়া যায় তার দারা সেকান্দরনামা' কাব্যের কয়েক লাইনে।

 বার্ধক্যের কালে তাঁর দুরবস্থার কথা উল্লেখ করতে কষ্ট হচ্ছে। কবিকে নিয়ে গত কয়েকদিন স্টাডি করে যতটা না তাঁর কাব্য প্রতিভার সাথে পরিচিত হয়েছি, তারচে বেশি জীবনব্যাপী তাঁর দুর্ভাগ্যের কথা জেনেছি। 

মৃত্যু 

গবেষকদের মতে আনুমানিক ১৫৯৬ কিংবা ১৫৯৭ খ্রিষ্টাব্দে মহাকবি আলাওল জন্মগ্রহণ করেন, ১৬১২ বা ১৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে আরাকানে আসেন এবং ১৬৭৩ খ্রিষ্টাব্দে আনুমানিক ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

পরিশেষে 

আলাওলের কাব্যরচনার একটি বিশেষ দিক এই যে, তিনি তৎসম শব্দের ব্যাপক ও সুদক্ষ প্রয়োগে তাঁর কাব্যে ইচ্ছেমতন সব ছন্দ সৃষ্টি করেছেন। আলাওল শব্দের ব্যবহার করতেন একজন শিল্পীর মতো। অনেক অপ্রচলিত অথচ সুন্দর শব্দ তিনি তাঁর রচনায় প্রচুর ব্যবহার করেছেন যা তাঁর প্রতিটা কাব্যকে বৈচিত্র্যময় ছান্দিক ও মনোরম করে তুলেছে।

হুমায়ুন আজাদ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, 'তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়ার মতো কবি। 

আসলেই তিনি পাঠ করার মতোই একজন কবি। সৃষ্টিকর্তা তাঁর কাব্য ও জীবন—দুইটাই পাঠ্য করে তুলেছিলেন বিভিন্ন ওঠা-নামা আর ঘটনা-দুর্ঘটনায়। দুঃখের ব্যাপার যে আমরা তার জীবন সম্পর্কে খুব একটা জানতে পারি না। সর্বজ্ঞাতা জানেন; কামনা করি যেন তাঁকে ওপারে ভালো রাখেন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url