হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর জীবনী । Alfamito Blog

আশরাফ আলী থানভী, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর জীবনী, আশরাফ আলী থানভী ওয়াজ আশরাফ আলী থানভী বই
Alfamito Blog
সূচিপত্র

 ইসলাম প্রিয় ব্যক্তিবর্গের জন্য প্রাণ সঞ্চারক অন্যতম একটি নাম হাকিমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত আশরাফ আলী থানভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, যার ছোট থেকে বেড়ে ওঠা, শিক্ষাযুগ, কর্মযুগ, আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি, রচনাশৈল্প, দৈনন্দিন কর্মসূচি, মুদ্দাকথা সুশৃংখল পূর্ণ চরিত্রের জুড়ি মেলা ভার।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর জীবনী

জীবনে ঘটমান বিষয়বলি তিনি সত্যিকার অর্থে একজন খাটি নায়েবে রাসূল হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে আর এ নশ্বর পৃথিবীতে তার সুস্পষ্ট গ্রহণযোগ্যতা উপর জগতে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রতি দিক নির্দেশ করে। তো আজ এমনি এক মহা মনীষী হযরত আশরাফ আলী থানভী র. এর জীবন নিয়ে আলোকপাত করবো। 

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর জীবনী।

আশরাফ আলী থানভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যিনি ছিলেন হাকিমুল উম্মত এবং মুজাদ্দিদুল মিল্লাত, প্রথমে আমরা ওনার সংক্ষিপ্ত জীবনী দেখে নিবো, অতঃপর বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

প্রশ্ন উত্তর
নাম মুহাম্মদ আশরাফ আলী
লকব থানভী
উপাধি হাকিমুল উম্মত, মুজাদ্দিদুল মিল্লাত
পিতা মুন্সী আব্দুল হক রহ.
জন্ম ১২৮০ হিজরী সনের ৫ রবিউল আউয়াল রোজ বুধবার।
মৃত্যু ১৫ই রজব ১৩৬২ হি. মোতাবেক ১৯ জুলাই ১৯৪৩ খৃ. এর মঙ্গলবার সন্ধ্যাবেলা।

থানভী (রহ.) এর জন্ম

হযরত আশরাফ আলী থানভী নামীয় দ্বীপ্তিবলয়ের আত্মপ্রকাশকাল ১২৮০ হিজরী সনের ৫ রবিউল আউয়াল রোজ বুধবার। আর তিনি ভারত ইউপি এর মুজাফফরনগর জেলার থানা ভবন এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন।

বংশ

হযরত থানভী রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন, অভিজাত বংশের সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন কৃতিকাল মহাপুরুষ। তার মাঝে ইসলামের দ্বিতীয় ও চতুর্থ খলিফার বংশের মিলন ঘটেছে। কেননা প্রভাবশালী, দানশীল ও অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী পিতা মুন্সী আব্দুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বংশধর এবং শ্রদ্ধেয়া নানীর বংশ চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রাঃ পর্যন্ত মিলেছে।

হাকীমুল উম্মত থানভী (রহ.) এর শিক্ষাযুগ

নিজ মহল্লায় তার প্রাথমিক শিক্ষার সদনস্থল সুদক্ষ পন্ডিত ফাতেহ মোহাম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে তিনি আরবী ভাষার প্রাথমিক কিতাব সমূহ ফার্সী ভাষার প্রাথমিক বিষয় সমূহ অধ্যায়ন করেন। এরপর ফারসি ভাষার উচ্চশিক্ষা লাভ করেন সম্মানিত মামা ওয়াজেদ আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির কাছে।

করেন সম্মানিত মামা ওয়াজেদ আলী (রহ.)-এর কাছে। ইসলামি শিক্ষায় পাণ্ডিত্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ১২৯৫ হিজরির জিলকদ মাসে বিশ্বখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাকেন্দ্র ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে রওনা হন। কৃতিত্বের সঙ্গে সেখানে পাঠ নেন রীতিমতো। শেষমেষ ১৩০১ হিজরি মোতাবেক ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করেন। তখন তার বয়স মাত্র বিশ বছর। দারুল উলূম দেওবন্দের তখনকার অন্যতম সদর হজরত মাওলানা ইয়াকুব নানুভাবি (রহ.) তার বিশেষ উপাদ ছিলেন। ভার তত্ত্বাবধানেই হজরত থানবি (রহ.) ইসলামি আইনশাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। তর্কশাস্ত্রের প্রতিও তার ঝোঁক ছিলো প্রবল। বহু তর্ক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি কৃতিত্বেও স্বাক্ষর রাখেন ছাত্র থাকা কালেই। মেধায় ছিলেন অনন্য। হজরত মাওলানা ইয়াকুৰ নানুভাবি (রহ.) তার জ্ঞানের পরিধি দেখে বলেছিলেন-'তুমি যেখানেই যাও না কেনো, তোমার সামনে কেউ মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারবে না।' আল্লামা আবদুল্লাহ মুহাজিরে মন্ডী (রহ.)-এর কাছে তিনি ইলমে কিরাত অধ্যয়ন করেন। তিনি ছিলেন সকল প্রকার জ্ঞানের অধিকারী একজন কালজয়ী মহাপুরুষ।

যেহেতু ভবিষ্যতে হযরত হাকিমুল উম্মত দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি খেদমত বিশেষত তাসাউফ ও শোলকের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক সংস্কারমূলক কাজ নেওয়ার ছিল তাই সে কাজের যোগ্যতা সৃষ্টির জন্য শরীয়ত ও তরিকতরে পারদর্শী এক অন্তর দৃষ্টি সম্পন্ন কামিল শায়েখ এর দরকার ছিল। ঘটনা প্রবাহের প্রতি লক্ষ্য করলে বুঝা যায় আল্লাহ তার পক্ষ থেকে শুরু থেকেই তার প্রতি হযরত হাজী সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহি বিশেষ দৃষ্টি আকৃষ্ট ছিল।

একবার বিশেষ কোন আলোচনা ও পূর্বোল্লেখ ছাড়াই তিনি নিজ এলাকাবাসী মুন্সী আব্দুল হক সাহেবকে নিজের পক্ষ থেকে বলে পাঠান যে, আপনি যখন হজ্জে আসবেন তখন পুত্র আশরাফ আলীকে অবশ্যই সাথে নিয়ে আসবেন। অথচ হযরত আশরাফ আলী থানভীকে (র.) তিনি কখনো দেখেননি তার জন্মই হয়েছিল হাজী সাহেব রহমতুল্লাহি আলাইহির হিজরতের পর।

সম্মানিত পাঠক! আশরাফ আলী থানবী রাঃ এর জীবনী সম্পর্কে আকর্ষণীয় ও চমৎকার বইয়ে চলছে বিশেষ ছাড় মূল্য ৪০%। আপনি চাইলে rokomari.com-থেকে বইটি কিনতে পারেন। আশা করি পড়ে ভাল লাগবে ইনশাল্লাহ।বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন

থানভী (রহ.) এর কর্মযুগ

হি. ১৩০১ সনে যখন হযরতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত হয়, ঠিক সেই সময়ই কানপূর ‘ফয়যে আম' মাদরাসায় একজন মুদাররিসের প্রয়োজন দেখা দেয়। হযরতকে সেখানে শিক্ষকতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি বছর কয়েক এ মাদরাসার শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর মাদরাসার ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক মনে না হওয়ায় তিনি এর সংগে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তারপর অনিবার্য কিছু কারণবশত তিনি কানপুর জামে মসজিদে দরস দিতে শুরু করেন। ফলে সেখানে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মসজিদের নামানুসারে তিনি তার নামকরণ করেন ‘মাদরাসা জামেউল উলূম'। মাদরাসাটি উত্তরোত্তর উন্নতি লাভ করতে থাকে। কিছুকালের মধ্যে চারদিকে এর নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠানটি অদ্যাবধি ইলমের দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে। 

হযরত থানভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এ প্রতিষ্ঠানে সুদীর্ঘ ১৪ বছর কাটান। এই দীর্ঘ সময়ে তার অসংখ্য যোগ্য শীর্ষ তৈরি হল, যারা তার অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করতেন। অপরদিকে কানপুরে অবস্থান থেকে একসময় তার অন্তর ভিন্ন হয়ে পড়লো তখন তিনি সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে সেখান থেকে থানা ভবন ফিরে আসেন।

আধ্যাত্মিকতা

শিক্ষাজীবন থেকেই আধ্যাতিকতার লাইনে বিশেষ ভাবমূর্তি দেখা যায় তার মাঝে। তখনকার বুজুর্গদের মাঝে ফকিহুন নাফস হজরত মাওলানা মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.)-এর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিলো তার। হজরতের ইন্তেকাল অবধি তা বহাল থাকে। জীবদ্দশায় কোনো এক সময়ে হজরত গাঙ্গুহি (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দে তাশরিফ নেন। তখন হজরত থানবি (রহ.) হজরতের কাছে বাইয়াত গ্রহণের আবেদন জানান। সে মুহূর্তে হজরত গাঙ্গুহি (রহ.) তাকে বাইয়াত করাটাকে অনোপযোগী মনে করলেন। 

কানপূরে অবস্থানকালে হি. ১৩০১ এর শাওয়াল মাসে তিনি পিতার সাথে পবিত্র হজ্জের সফর করেন। এ সময় হযরত হাজী ছাহেব রহ.-এর সাথে সাক্ষাত হয় এবং সরাসরি তাঁর হাতে হাত রেখে বায়'আতের সৌভাগ্য লাভ হয়। শায়খ রহ. তাকে কিছুকালের জন্য নিজের কাছে রেখে দিতে চাইলেন, কিন্তু ওয়ালিদ ছাহেব তাকে ছেড়ে আসতে সম্মত হলেন না। তাকে সংগে

হি. ১২৯৯ সনে হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গংগুহী রহ. যখন হজ্জের সফরে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত থানভী রহ. তাঁর মারফত হযরত হাজী ছাহেব রহ.-এর কাছে একটি চিঠি পাঠান, তাতে অনুরোধ ছিল, তিনি যেন তাকে বায়আত করে নেওয়ার জন্য হযরত গংগুহীর কাছে সুপারিশ করেন। হযরত হাজী ছাহেব রহ. বিষয়টি হযরত গংগুহী রহ.-এর কাছে উত্থাপন করলেন। ক্ষনিক পর বললেন, ঠিক আছে বরং আমি নিজেই তাকে বায়আত করে নিচ্ছি। পত্র মারফত এও জানালেন যে, নিশ্চিন্ত থাকুন আমি নিজেই আপনাকে বায়'আত করে নিয়েছি।

নিয়েই দেশে ফিরলেন। ফিরে আসার সময় হাজী ছাহেব রহ. বলে দিলেন পরের বার যখন হজ্জে আসবে অন্ততপক্ষে ছয়মাস থেকে যাওয়ার সংকল্প করে আসবে। সুতরাং হি. ১৩১০ সনে পুনরায় হজ্জযাত্রা হলে অকৃত্রিম মনোবাসনা ও হযরত শায়খের ইচ্ছা মোতাবেক সেখানে টানা ছয়মাস অবস্থানের ইচ্ছা নিয়েই গেলেন।

খানকায়ে ইমদাদিয়ায় যখন

হজরত হাজি সাহেব (রহ.)-এর উপদেশমতে হজরত থানবি (রহ) ১৩১৫ হিজরিতে থানাভবনে 'খানকায়ে ইমদাদিয়া'র অবস্থান করতে লাগলেন। একে একে ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার মধ্য দিয়ে বেশ উজ্জ্বলতা সৃষ্টি হতে লাগলো। খানকায়ে ইমদাদিয়া পরিণত হলো অন্তর ব্যান্ডি ব্যক্তিদের চিকিৎসাকেন্দ্রে। আমজনতা থেকে আরম্ভ করে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বমহলের লোকজন ছুটে আসতে লাগলো। এভাবে লোকজনের ব্যাপক জমায়েত হতে লাগলো। যার ফলে তখনকার শাসনব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ ছোট্ট শহর 'থানাভবন'কে রেলস্টেশন ঘোষণা করতে বাধ্য হলো। শিয়ানের সংখ্যা শতো শতো নয়, লাখ ছাড়িয়ে গেলো। উল্লেখ, তা শুধু মুক্তাঞ্জ (বাইয়াতের অনুমতিপ্রাপ্ত) শাগরিদদের সংখ্যা দেড়শোরও অধিক। যাদের মাধ্যমে তার বরকত আরা পৃথিবীদয়। তার মেহনতের সীমা এবং প্রস্তাব শুধু পাক-ভারতে নয়, হেজাজ- আফ্রিকা সবখানেই বিরাজমান। তার কারণেই একসময় ভারত মুসলিম জনবসতিতে রূপ নেয়।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর দৈনন্দিন কার্যসূচী

হযরত রহ.-এর বাসগৃহ ছিল খানকাহ থেকে সামান্য দূরে। খানকার ভেতর একটি ছোট প্রাচীন মসজিদ আছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামায তিনি সেই মসজিদেই আদায় করতেন এবং নিজেই তাতে ইমামত করতেন। শেষ জীবনে শারীরিক দূর্বলতা এবং আরও কিছু ওযরের কারণে একজন কারী ছাহেবকে ইমাম বানিয়েছিলেন। দক্ষিণ দিকে মসজিদ সংলগ্ন একটি তিনদুয়ারী ছিল। তাতে হযরত হাজী ছাহেব রহ.-এর আমলের দু'টি কামরা আছে। এই তিন দুয়ারীতেই ছিল হযরতের বৈঠকখানা এবং এখানেই তার মজলিস হত। খানকার একদিকে আরও কয়েকটি কামরা ছিল। মেহমান ও যাকিরীন এসে তাতেই অবস্থান করতেন।

ফজরের আযানের পরপরই হযরত খানকায় আসতেন। নামাযের পর মামুলি কিছু প্রয়োজন সেরে বাইরে মাঠে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতেন আর এ অবস্থায়ই তিনি নিজের কিছু অজিফা আদায় করে নিতেন। ফিরে এসে খানকার তিনদুয়ারীতে ইশরাক পড়তেন। তারপর কিছুক্ষনের জন্য বাড়িতে চলে যেতেন। ফিরে আসার পর সাধারণত এগারটা পর্যন্ত রচনা-সংকলনের কাজে মশগুল থাকতেন। সাধারণভাবে এ সময় কারও সাক্ষাতের অনুমতি

ছিল না। বিশেষ কোন মেহমান সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এসে থাকলে লেখার কাজ শেষ করে, খাস মজলিসে কিছু সময় তাকে দিতেন। তা না হলে বাড়ি চলে যেতেন। খানা খাওয়ার পর সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতেন। তারপর খানকায় এসে কায়লূলা করতেন। জোহরের আযান হলে নামাযের প্রস্তুতি নিতেন। জোহরের নামাযান্তে আছর পর্যন্ত খানকার তিনদুয়ারীতে ‘আম মজলিস' হত। তাতে এলাকাবাসী ও বাইরের মেহমানগণ শরীক হতেন। তাদের মধ্যে উলামা, যাকিরীন, আমীর-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব রকমের লোক থাকত। রোযানা তাদের সংখ্যা কম-বেশি বিশ-পঁচিশজন হত। তাতে বাইরের কেউ উপস্থিত হলে মুসাফাহার পর সংক্ষেপে তার খোঁজ খবর নিতেন তারপর যেখানে সমিচীন মনে হত তাকে বসতে বলতেন। তার সাথে দীর্ঘ কথা বলতেন না, যাতে বেশিক্ষণ একজনাতে নিবিষ্ট থাকার কারণে মজলিসের অন্যান্যগণ অস্বস্তিবোধ না করে ।

উপস্থিত সকলে নীরবে বসে হযরতের কথা শুনত। কখনও কেউ সংগত কোন প্রশ্ন করলে তার উত্তর দিতেন। কেউ তাবীয চাইলে লিখে দিতেন। দু'আ চাইলে দু'আ করে দিতেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন বিষয়েই কথা বলতেন। কখনও অবস্থার চাহিদা ও সাময়িক প্রয়োজন সম্পর্কে মতামত দিতেন, কখনও বুযুর্গানে দ্বীনের অবস্থা ও ঘটনা শোনাতেন, কখনও সাধারণ ওয়ায-নসীহত করতেন, কখনও তাসাওউফ ও সুলূক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দিতেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অধিকাংশ সময় তার এসব নসীহত ও তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করা হত এবং তা প্রকাশও করা হত। এভাবে ‘আল ইফাদাতুল-ইয়াওমিয়্যা: নামে কয়েক খন্ডবিশিষ্ট একখানি সুবৃহৎ গ্রন্থ সংকলিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। গ্রন্থখানি শরীআত, সুন্নত ও তরীকতের বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান-তত্ত্বের এক মহামূল্যবান ভান্ডার ।

এ সময়কালে তিনি চিঠিপত্রে উত্তরও লিখতেন, দৈনিক যার সংখ্যা পচিশ- ত্রিশের কম হত না। প্রতিদিনের চিঠির উত্তর অবশ্যই সেদিনই পাঠাতেন যাতে চিঠিদাতাকে অপেক্ষার যন্ত্রণা পোহাতে না হয়। অধিকাংশ চিঠিই যারা ইসলাহী সম্পর্ক রাখত তাদের কাছ থেকে আসা। তারা নিজেদের আত্মিক খটকা, সংশয় ইত্যাদি অবস্থা কিংবা দ্বীনী বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে চিন্তা-চেতনা ও মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সমাধা জানতে চাইত অথবা তাসাওউফ ও সুলূক সম্পর্কে কোন বিষয় জানার আগ্রহ প্রকাশ করত। হযরত রহ. এসব কিছুরই

উত্তর নগদ-নগদ চিঠির পাশেই লিখে দিতেন। যে সব চিঠিতে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকত উত্তরসহ তা বাছাই করে রাখা হত এবং চিঠিদাতার নাম ছাড়া তা নিয়মিত প্রকাশ করা হত। এভাবে 'তারবিয়াতুস সালেক' নামে কয়েক খন্ডের বৃহগ্রন্থ অস্তিত্ব লাভ করে। কোন কোন চিঠিতে ফিকহী মাসাইল বা সমকালীন বিষয়াবলী সম্পর্কে শরঈ ফয়সালা জানতে চাওয়া হত। এ জাতীয় বিশেষ-বিশেষ চিঠিও জবাব সহকারে বেছে রাখা হত ও যথাসময়ে প্রকাশ করা হত। পরবর্তীতে তাই ‘ইমদাদুল-ফাতাওয়া' নামে সুবৃহৎ ফাতাওয়া গ্রন্থরূপে প্রকাশ লাভ করে। এসব কাজের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন এ মজলিস আছরের আযান পর্যন্ত চলত। আছরের নামায আদায়ের পর তিনি পালাক্রমে তার দুই (স্ত্রীর) ঘরে কিছু সময়ের জন্য যেতেন আবার মাগরিবের আযানের আগে আগে ফিরে আসতেন। নামাযের পর কিছুক্ষণ তিনদুয়ারীতে অবস্থান করতেন এবং খুঁটিনাটি কিছু কাজ এ সময় সমাপ্ত করতেন।

বায়'আত করার কাজটিও তিনি সাধারণত মাগরিবের পরই সমাধা করতেন। তারপর ঘরে চলে যেতেন। ইশার নামায মসজিদে এসেই আদায় করতেন। তারপর বিশ্রামের জন্য ঘরে চলে যেতেন,

চব্বিশ ঘন্টার এই সাদামাঠা কর্মসূচী তিনি বছরের পর বছর পালন করে গেছেন। পরিবেশ-পরিস্থিতির যত রদবদলই ঘটুক তার এ কর্মসূচীর কোনও ব্যত্যয় হত না। এমনই ছিল তার ইসতিকামাত ও নিয়মনিষ্ঠতা, যা কারামত অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ। যখন যে অবস্থাতেই তিনি থাকতেন, মনে হত সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত মনে আছেন কোনও রকমের ব্যস্ততা নেই। কিন্তু যখন তার কর্মময় বর্ণিল জীবন ও বহুমাত্রিক রচনাসম্ভারের প্রতি দৃষ্টিপাত করা হয়, বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যে, একজন মাত্র মানুষ জ্ঞান-গবেষণা এবং সংস্কার ও প্রচারমূলক এতসব কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, যা বড়-বড় সংস্থার পক্ষেও সম্ভব ছিল না । বস্তুত এটা ছিল তার অসাধারণ সময়ানুবর্তিতারই সুফল। এরই বরকতে তিনি দ্বীনের সংস্কার ও প্রচার প্রসারধর্মী কর্মতৎপরতায় লিপ্ত থেকে নিজ জীবদ্দশাতেই উম্মতের জন্য রচনা ও বক্তৃতামালার এক বিস্ময়কর ও অতুল ভান্ডার সরবরাহ করে গেছেন, যা দ্বারা শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ নিজেদের জ্ঞান-পিপাসা নিবারণ ও ধর্মপথের আলো আহরণ করতে পারবে।

লেখালেখি

বর্তমান শিক্ষার উন্নতির যুগে লেখক ও লেখনীশক্তির জয়জয়কার। যেকোনো বিষয়েই হাজারও গ্রন্থ মেলে হাতের নাগালে। বইয়ে ঠাসা গ্রন্থাগার। প্রত্যেক লেখকেরই কোনো না কোনো দিক দিয়ে বিশেষত্ব রয়েছে। সবাইই নিজ নিজ জ্ঞানপাণ্ডিত্যের আসনে সমাসীন। ভাষা-সাহিত্যের ময়দানে অভিন্ন। গভীর চিন্তা ও অধ্যায়নে প্রশস্ত। মোটকথা, লেখনীর এমন কোনো গুণ নেই, যা লেখকদের মাঝে নেই। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় হলো, বিশাল গ্রন্থগারে ক'টা বই রয়েছে, যা ইখলাসের সঙ্গে রচিত। ক'জন লেখকই বা আজকাল ইখলাসের সঙ্গে কলম ধরছেন? এ সম্বন্ধে একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। কোনো এক লেখক দীনের খেদমত ও চরিত্র গঠনে একটি বই রচনা করেন। গ্রন্থখানা যুগের একটি বড় পুঁজি ছিলো । প্রকাশিত হলো। বাজারে প্রচার হলো । মানুষ পড়তে ও কেনাবেচা আরম্ভ করলো। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনে বদল এলো। ছাপানোর কাজে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলো। কোনো এক সময় একটি গোষ্ঠী লেখকের চিন্তাচেতনায় উদ্বেলিত হয়ে বললো-'এসো, আমরা এই অমূল্য গ্রন্থখানা রচনাকারীর সঙ্গে সাক্ষাত করি। তার সান্নিধ্যে থেকে আত্মার দীনি চিন্তায় উপকৃত হই। যার লিখিত বইয়ে এতো উপকৃত হলাম, না জানি তার সান্নিধ্যে কতোই না উপকৃত হতে পারবো।' এভাবে পাঠকদের বিরাট একটি দল লেখকের গ্রামে উপস্থিত হলো। সেখানকার অধিবাসীদের কাছ থেকে লেখক সম্বন্ধে জানতে পারলো সব। এরপর তাদের হাতের তোতা পাখিটি উড়ে গেলো। কারণ লেখক সাহেব সর্বদা মদ-জুয়োয় অভ্যস্ত। গ্রন্থখানা তো তিনি জীবিকা উপার্জনের জন্যই রচনা করেছেন। এটা মাত্র একটি ঘটনা। এভাবে খুঁজে দেখলে বর্তমান শতাব্দেরও বহু লেখককে এমন মিলবে। তবে এখনও এমন অনেক লেখক রয়েছেন, যারা ইখলাসের সঙ্গে আল্লাহর জন্যই লেখালেখি করেন। আর সে অনুযায়ী নিজেদের জীবনকেও গঠন করে থাকেন। ফলে তাদের লেখায় সবাই উপকৃত হচ্ছে রোজ। কিন্তু এমন লেখক হাতেগোনা কিছুমাত্র । এমন লেখকদের অন্যতম একজন ইসলামি দার্শনিক মুজাদ্দিদে মিল্লাহ হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (রহ.)। যার লেখনীর মাধ্যমে গোটা বিশ্ব উপকৃত হয়েছে, হচ্ছেও। তার সুবিশাল রচনাবলির কথা সংক্ষেপে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে তার লেখনীর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পর্কে কেবল আলোচনা করা হচ্ছে। নাম যার ‘বেহেশতি জেওর')। নামটা শুনেই হয়তো কারো মনে আসতে পারে, এটা এমন কী গ্রন্থ হলো, যার জন্য এ বিশাল আলোচনার প্রয়োজন হলো? যদি তার লেখনী সম্পর্কেই আলোচনার প্রয়োজন ছিলো, যার দ্বারা পাঠকগণ অধিক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। তাহলে ‘তাফসিরে বয়ানুল কোরআন'-এর কথা বলা যায়। কিন্তু বলবো, আপনার ধারণা সঠিক। কিন্তু বান্দা নিজেকে এ বিষয়ে অপারগ মনে করে। “তাফসিরে বয়ানুল কোরআন’সহ তার লেখা অন্যান্য গ্রন্থ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যতোদূর দীনি- আমলি উপকারের সম্পর্ক ‘বেহেশতি জেওর'-এর সঙ্গে, তা বর্তমান সময়কার হাজার হাজার গ্রন্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । প্রকাশ থাকে, দু-বছর আগে এক প্রসিদ্ধ একটি পত্রিকার সম্পাদককে প্রশ্ন করা হলো-‘পৃথিবীতে মানব রচিত কোন গ্রন্থটি অধিক পাঠ করা হয়?' তিনি অকপটে ‘বেহেশতি জেওর'-এর কথা উল্লেখ করলেন। এ ঘটনা দ্বারা বোঝা যায়, বর্তমান যুগে ‘বেহেশতি জেওর’ই একটি এমন কিতাব, যা প্রত্যেকের ঘরে ঘরে রয়েছে এবং সর্বাধিক পাঠ্য। গ্রন্থটিতে নেই কোনো ভাষার উচ্চতা কিংবা কাঠিন্য । কিন্তু দুনিয়ার অন্য সমস্ত গ্রন্থে এসব বিদ্যমান। আর ‘বেহেশতি জেওর'-এর এ বৈশিষ্ট্য হলো হজরত হাকিমুল উম্মাহ থানবি (রহ.)-এর ইখলাসের কারণে। এ কথা সাহস করে বলা যায়, বর্তমান যুগে অধিক পাঠ্যগ্রন্থ হলো, 'বেহেশতি জেওর'। এটাই তার অন্য সমস্ত লেখক থেকে অনন্য মর্যাদার জন্য যথেষ্ট ।

ফিত্নার প্রতিরোধকল্পে হযরত রহ. অত্যন্ত জোরদার তাবলীগী কার্যক্রম শুরু করলেন। বিভিন্ন শিরোনামে তিনি এ বিষয়ে অসংখ্য ওয়ায-নসীহত করেছেন এবং বহু বই-পুস্তক লিখে প্রকাশ ও প্রচার করেছেন। এ প্রসঙ্গে ‘ইনতিবাহাতে মুফীদা' ও ‘বেহেশতী যেওর' এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য । আরও আছে ফুরূউল ঈমান, ইসলাহুল-খিয়াল, হায়াতুল মুসলিমীন, আদাবে মুআশারাত, ইসলাহে ইনকিলাবে উম্মত, ওয়াজে ইসলামে হাকীকী, মাহাসিনে ইসলাম, দাওয়াতুল হক ইত্যাদি। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় দেশ ও দেশের বাইরে সর্বস্তরের মুসলিমগণ এগুলো দ্বারা অভাবনীয় উপকার লাভ করে। তারা পেয়ে যায় সত্য-সঠিক পথের দিশা।

সম্মানিত পাঠক! আশরাফ আলী থানবী রাঃ এর লেখা সকল আকর্ষণীয় ও চমৎকার বইয়ে চলছে বিশেষ ছাড় মূল্য ৪৫%। আপনি চাইলে rokomari.com-থেকে বইগুলো কিনতে পারেন। আশা করি পড়ে ভাল লাগবে ইনশাল্লাহ।বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন

কৌশল ও সুক্ষদর্শিতা

হজরত থানবি (রহ.)-এর কাছে এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে আরজ করলো-‘জনাব! অমুক ব্যক্তি হজরত রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.)-এর পবিত্র কবরে ফুল পেশ করেছে।' তিনি কিছু সময় চুপ থাকলেন । এরপর বললেন-‘তাকে ডাকো।' সে লোকটিকে হাজির করলো। হজরত লোকটিকে বললেন-‘হজরত গাঙ্গুহি (রহ.) কেমন মানুষ ছিলেন?' উত্তরে সে বললো-'বড় বিজ্ঞ আলেম ও বুজুর্গ।' হজরত থানবি (রহ.) বললেন-‘আমারও এমনই ধারণা।' এরপর বললেন-‘তোমার কী ধারণা, তিনি কি জান্নাতবাসী হবেন নাকি দোজখে পুড়বেন? লোকটি উত্তর দিলো-“তিনি তো জান্নাতবাসী।' এরপর বললেন-‘তার জন্য কি হরেক রকম নেয়ামত উপস্থিত হয় না।' লোকটি হ্যাঁ-সূচক উত্তর করলো। হজরত বললেন-“সে নেয়ামতের মধ্যে ফুলকি থাকবে না? কারণ হাদিসে তো আছে, জান্নাতবাসী যা চাইবে, পাবে।' বললেন-'তাহলে এ কথা প্রকাশ হয়ে গেলো, তার অফুরন্ত নেয়ামত উপস্থিত। এটাও প্রকাশ পেলো, সে ফুল দ্বারা কোনো উপকার হয় না। কারণ তার কাছে ওর চেয়েও অনেক উত্তম ফুল উপস্থিত রয়েছে।' সে এসব কথা শুনে খুবই লজ্জিত হলো । হজরতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলো। 

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর ইন্তেকাল

মুসলিমজাতিকে সত্যের উচ্চ আসনে সমাসীন করে ১৬/১৭ রজব ১৩৬২ হিজরিতে রাব্বুল আলামিনের ডাকে সাড়া দেন তিনি। তার ইন্তেকালে যেনো দুনিয়ার সমস্ত প্রাণির ওপর নেমে এলো শোকের ছায়া। কেমন যেনো দিনের একটি সূর্যই অস্তমিত হয়ে গেলো। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিলো ৮২ বছর ৩ মাস ১০ দিন। যে সময়ের মধ্যে তিনি অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি জাতিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহতায়ালা তাকে ক্ষমা করে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমাদেরকে পরপারে তার সঙ্গী হবার তৌফিক দান করুন । এ পৃথিবী শুনতে পেলো একজন মহামনীষীর বিদায় নেবার কথা। সমস্ত থানবিপ্রেমিক বেহুশ হয়ে পড়লেন। আরম্ভ হলো দিল্লি ও আশপাশ থেকে ট্রেন ছুটে আসার নিরবচ্ছিন্ন আওয়াজ। সকাল হতে না হতেই সবাই হজরতের বাড়ি এসে পৌঁছোন। লাখো আশেকের সামনে বের করা হলো তার জানাজা । ঈদগাহেই জানাজা আদায় করা হলো। সবশেষে তার নিজস্ব ওয়াকফ করা কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হলো। নাম যার 'কবরস্তান-ই ইশক বাজান'।

দ্বীনের এই সমুজ্জল সূর্য অর্ধশতাব্দীর বেশি কাল মুসলিম জাহানের দিকবলয়ে ঈমানের আলো বিকিরণ করতে থাকে। পরিশেষে ১৫ই রজব ১৩৬২ হি. মোতাবেক ১৯ জুলাই ১৯৪৩ খৃ. এর মঙ্গলবার সন্ধ্যাবেলা তার অস্তগমন ঘটে। পেছনে থেকে যায় সেই আলোর অফুরান ধারা। তখন বয়স ৮২ বছর। ইন্নলিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন ।

Rate This Article

Thanks for reading: হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) এর জীবনী । Alfamito Blog , Sorry, my English is bad:)

Getting Info...

إرسال تعليق

Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.